১১ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার

মাল্টা’ চাষে বরিশালের সজল সরকারের ব্যাপক সাফল্য

আপডেট: অক্টোবর ১৮, ২০১৯

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

গৌরনদী প্রতিনিধি

এবার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বারি-১ জাতের মাল্টা (কয়েন মাল্টা)’র চাষ করে ব্যাপক সাফলতা অর্জন করেছেন বরিশালের গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া গ্রামের আতœপ্রত্যয়ী যুবক ও সফল চাষী সজল সরকার। এর আগে ইরি-বোরো ধান চাষ, হাড়িভাঙ্গা আম চাষ, নানা জাতের মৎস্য চাষ ও মুরগী পালন করে একের পর এক সফলতার উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এসেছেন তিনি। চাষাবাদে সফল এ যুবকটি ইতোমধ্যে তৈরী করেছেন সফলতার অনেক গল্পগাথা।

চাষাবাদে ধারাবাহিক সফলতার পথে হেটে এবার নিজেদের মাছের ঘেরের পাড়ে বারি-১ জাতের মাল্টা (কয়েন মাল্টা) চাষ করে দারুন সফলতা অর্জন করে চারিদিকে বেশ সাড়া ফেলেছেন ওই গ্রামের খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বী মৃত সমিরন সরকারের এ ছোট ছেলেটি। ফলে সজল যেমন সফলতার তৃপ্তির হাসি হাসছেন, ঠিক তেমনই তাকে নিয়ে গর্ব করছেন তার পাড়া-প্রতিবেশী, আতœীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব ও এলাকাবাসী।

বরি-১ জাতের ‘মাল্টা’ চাষ অর্থনৈতিকভাবে বেশ লাভজনক হওয়ায় এক সময় নিজের মাছের ঘেরের পাড়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এ জাতের মাল্টা বাগান করার খুব আগ্রহ জাগে আতœ প্রত্যয়ী যুবক ও গৌরনদীর সফল চাষী সজল সরকারের মনে।

ফলে, গৌরনদী উপজেলা কৃষি অফিসের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও সহযোগীতা নিয়ে তিনি সংগ্রহ করেন বারি-১ জাতের মাল্টা’র (কয়েন মাল্টা’র) ৭০টি চারা। এখানে উলেøখ্য যে, বারি-১ জাতের মাল্টাগুলোর পাছায় জন্মগতভাবে পঞ্চাশ পয়সা বা এক টাকার কয়েনের আদলে একটি ষ্পষ্ট ছাপ থাকে। এ কারনে বারি-১ জাতের এ মাল্টাকে কয়েন মাল্টা নামেও অভিহিত করা হয়।

জানাগেছে, পার্শ্ববর্তি উজিরপুর উপজেলার শিকারপুর এলাকার একটি নার্সারী থেকে ২০১৬ সালে বারি মাল্টা-১ (কয়েন মাল্টা’র) জাতের ৭০টি মাল্টা চারা সংগ্রহ করে সফল চাষী সজল সরকার (৪৬) নিজেদের মাছের ঘেরের পাড়ে ওই মাল্টা চারাগুলো রোপন করেন। এরপর কৃষি অফিসের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়ে তিনি ওই চারাগুলোর সঠিক পরিচর্যা চালিয়ে যান। মাত্র আড়াই বছরের মাথায় এসে প্রতিটি গাছে ফুল আসে এবং ফল ধরতে শুরু করে। প্রথমবারেই তার ৭০টি মাল্টা গাছে ১২ মনেরও অধিক ফল ধরেছে। ইতোমধ্যে তার বাগানের গাছ থেকে তিনি ৫ মনের অধিক মাল্টা বিক্রি করেছেন। বাগান দেখতে আসা দর্শনার্থী, প্রতিবেশী ও আতœীয় স্বজনকে প্রায় ২ মন মাল্টা উপহার হিসেবে বিনামুল্যে দিয়েছেন। এখনও তার বাগানের গাছে ৫ মনের বেশী মাল্টা রয়েছে। মাল্টার চারা ক্রয়, রোপন ও পরিচর্যা করতে গিয়ে সার, ঔষধ ও কীটনাশকের ব্যাবহারসহ অন্যান্য খরচ বাবদ তার প্রায় ৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রথমবারেই তার মাল্টা বাগানের ওই ৭০টি গাছে যে পরিমান ফল ধরেছে তা থেকে বিনামুল্যে বিতরণের পরেও কম করে হলে তিনি ৬০ হাজার টাকা আয় করতে পারবেন বলে আশা করছেন। তার গাছে ফলা মাল্টাগুলো বেশ রসালো এবং দারুন মিষ্টি। এ কারনে তিনি মাল্টা তুলে পার্শ¦বর্তি মাহিলাড়া বাজারের ফলের দোকানে দেয়া মাত্রই সেগুলো বিক্রি হয়ে যায়।

সরেজমিন সজল সরকারের মাল্টা বাগান ঘুরে দেখা গেছে, তার বাগানের প্রতিটি গাছে থোকায় থোকায় মাল্টা ফল ঝুলে আছে। যার নান্দনিক সৌন্দর্য্য মুগ্ধ করছে বাগান দেখতে আসা দর্শনার্থীদেরকে।

এ সময় আলাপকালে সফল চাষী সজল সরকার জানান, প্রথম বছরেই তার বাগানের গাছে এত ফলন আসবে এটা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি। এর আগে ২০১৪ সালে তিনি কৃষি উন্নয়ন অধিদপ্তরের দ্বিতীয় শষ্য বহুমুখী করন প্রকল্প (এসসিডিপি)’র সহয়তায় নিজেদের ২০শতক জমিতে হাড়িভাঙ্গা জাতের ৩২টি আমের চারা রোপন করে একটি আম বাগান গড়ে তোলেন। গত মৌসুমে ওই বাগানের আম গাছে প্রথমবার ফল ধরে। এ সময় পাড়া-প্রতিবেশী ও আতœীয় স্বজন ও বাগান দেখতে আসা দর্শনার্থীদের মাঝে উপহার হিসেবে বিনামুল্যে প্রায় আড়াই মন আম বিতরণের পরও তিনি ওই হাড়িভাঙ্গা আম বিক্রি করে ৮০ হাজার টাকা আয় করেছিলেন। এ ছাড়া ২০০৯ সালে নিজের ইবি-বোরো ÿেতে তিনি শতাংশ প্রতি প্রায় দেড় মন ধান উৎপাদন করে দেশব্যাপী আলোড়ন তুলেছিলেন। যার জৈষ্ঠ প্রতি উৎপাদন ছিল ২৯ মন ২৫ কেজী। ফলে কৃষিকাজে অবদান রাখার জন্য আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবস ২০০৯ উপলÿে শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে তাকে শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত পদক-২০০৯ প্রদান করা হয়। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া প্রায় ১৪ একর জমি জুড়ে রয়েছে তাদের বাড়ি, ফলের বাগান, পোল্টি ফার্ম ও মাছের ঘের। তিনি ও তার বড়ভাই মিলে পৈত্রিক ওই মাছের ঘের থেকে বছরে বিভিন্ন জাতের প্রায় ৮শ থেকে ১ হাজার মন মাছ উৎপাদন করেন। পাশাপাশি তার ১৩শত মুরগী পালনের জন্য একটি পোল্টি খামার রয়েছে। ইতোপূর্বে ওই পোল্টি খামারে পালিত মুরগী থেকে প্রতিদিন গড়ে ১২শত ডিম পেতেন। কয়েক মাস আগে মুরগীগুলো ডিম দেয়া শেষ করলে তিনি খামারের সকল মুরগী বিক্রি করে দেন। এখন খামারে ১৩ শত লেখার মুরগীর বাচ্চা রয়েছে। আগামী ৩/৪ মাসের মধ্যে তারা ডিম দিতে শুরু করবে।

গৌরনদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ মামুনুর রহমান জানান, এগুলো পাহাড়ি অঞ্চলের ফল হলে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট ২০০৩ সালে সমতল অঞ্চলে চাষের উপযোগী করে বারি-১ জাতের মাল্টা’র এ জাতটি উদ্ভাবন ও অবমুক্ত করে। বারি-১ জাতের এ মাল্টাটি উচ্চ ফলনশীল ও নিয়মিত ফলদানকারী ভিটামিন সি সমৃদ্ধ একটি ফল। পাঁকা ফল দেখতে বেশ আকর্ষণীয় এবং খেতেও ভিশন সু-স্বাদু। ফল্গুন মাসের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে এ মাল্টা গাছে ফুল ধরা শুরু করে। এরপর ফুল থেকে ফল হয় এবং আশ্বিন, কার্তিক মাসে ফল পাঁকতে শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে প্রতিটি গাছে ৩০ থেকে ৫০টি এবং পূর্ণাঙ্গ বয়সে দেড়শ থেকে দু’শ’টি ফল ধরে। আর হেক্টর প্রতি এর ফলন হয় প্রায় ২০ মেট্রিক টন। মাল্টা চাষে অল্প খরচে অধিক লাভ করা সম্ভব। সফল চাষী সজল সরকারের মত এ অঞ্চলের চাষীরা যদি মাল্টা চাষে এগিয়ে আসে, তা হলে একদিকে যেমন দেশের বাজারে বিদেশ থেকে আনা মাল্টা’র আমদানী কমে আসবে, অন্যদিকে তেমন আমরা বিষমুক্ত দেশীয় মাল্টা খাওয়ার সুগোগ পাবো। তিনি আরো বলেন, মাল্টা চাষের প্রতি আমাদের দেশীয় কৃষকরা যত বেশী আগ্রহী হয়ে উঠবে, ততো বেশী মাল্টা বাগান গড়ে উঠবে এবং তত দ্রæত সময়ের মধ্যে দেশের পাইকারী ও খুজরা বাজারে মাল্টার চাহিদা মেটাতে সÿম হব। সেই সাথে দেশের মানুষের ভিটামিন সি এর ঘাটতি পূরন হবে। ##

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
   
Website Design and Developed By Engineer BD Network