২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, শুক্রবার

 

নিজ শহরেই উপেক্ষিত শহীদ আলতাফ মাহমুদ

আপডেট: নভেম্বর ৩, ২০১৯

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

অপূর্ব গৌতম

সেদিনও এমনি নীল গগনের বসনে শীতের শেষে রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে; পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকনন্দা যেন, এমন সময় ঝড় এলো এক ঝড় এলো খ্যাপা বুনো।। উপরের চরণ চারটি বিখ্যাত একটি গানের অংশ বিশেষ। কিন্তু আমরা অনেকেই এই চরণগুলির সাথে পরিচিত নই। গান গাইতে গাইতে এই চরণ পর্যন্ত আমাদের অনেকেরই আসা হয় না। বিখ্যাত এই গানটির প্রথম স্তবক ছাড়া অন্য স্তবকগুলি শতকরা আটানব্বই ভাগ মানুষই হয়তো জানেন না বা এর সাথে পরিচিত হননি। এই যে না জানা বা পরিচিত না হওয়া আমি এটাকে দোষের কিছু মনে করি না। আমরা অনেকেই জানিনা বিদ্যুৎ কিভাবে উৎপন্ন হয় কিন্তু বাস্তবতা হলো একটি সুইচে চাপ দিয়ে আমরা আলো জ্বালাই এবং সে আলোতেই অন্ধকার দূর হয়। অতএব বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পর্কে আমার জ্ঞান না থাকলেও চলবে কিন্তু জানতে হবে কোন সুইচটায় চাপ দিলে আলো জ্বলবে। সুইচে চাপ দেওয়াটা এখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তেমনি একটি বিখ্যাত গানের কলি আমকে সব জানতে হবে, মুখস্থ করতে হবে, আওরাতে হবে এর কোন দরকার নেই। এই গানটি যে কোন সচেতন-অসচেতন এমনকি বোল ফোটেনি যে শিশুর অথবা অশীতিপর বাকরুদ্ধ ব্যক্তিও যখন শোনেন তখন আবেগে আবেশে ভাইয়ের ছোঁয়া অনুভব করেন। ভাইয়ের শরীরের রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে মিশেছে বুড়িগঙ্গা-পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-কীর্তনখোলায়। আমরা কি আজও ভুলতে পারি সে কথা। ফেব্রুয়ারি এলে এমন কে আছে গুণগুণিয়ে গায় না ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’। অমর সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদ ১৯৫৪ সনে সুরারোপ করলেন আব্দুল গাফফার চৌধুরীর লেখা গানে। দু’জনেই বরিশালের সন্তান। আজ পর্যন্ত যে ক’জন ব্যক্তি বাংলাকে বিশ্বের কাছে অনন্য উঁচ্চতায় আসীন করেছেন শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দ দাশ এবং অমর সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। এই গুণিদ্বয় বরিশাল শহরের মানুষ। আমি সেই শহরে বসবাস করি। আমি গর্বিত। আমি মূলত: ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’ গানটি নিয়ে কথা বলছি। গানটির যে স্তবকটি উদ্বৃত করার চেষ্টা করছি সেটা যদি একটু বিশ্লেষণ করি তবে দেখবো, নীল গগন, শীতের শেষ, রাত জাগা চাঁদ, চুমো, হাসাহাসি, রজনীগন্ধা, অলকনন্দা কি মায়াময় একটি পরিবেশ, কতই না আপন প্রকৃতি, কি মধুর সুখানুভূতি। এরপরই আমরা চতুর্থ চরণে দেখতে পাই ঝড় এলো, ঝড় এলো, খ্যাপা বুনো। হঠাৎ ঝড়ে অবশ্যই স্বাভাবিক ছন্দে পতন ঘটে। ছোট-বড়, ধনী-গরীব সকলেই যেন নড়বড়ে হয় যায়-যা তারা প্রত্যাশা করে না। ঝড়-সেতো শক্তিশালী, দানবের মতো। এটাকে উপরে ফেলে, ওটাকে ভেঙে ফেলে, এটাকে উল্টিয়ে দেয়, ওটাকে পাল্টিয়ে দেয়। ক্ষমতা থাকলে যা হয় আর কি ? সমস্যাটা হলো, ঝড় বোঝে না সাধারণ মানুষের ক্ষমতা। ঝড় মোকাবেলা করেই মানুষ বাঁচতে চায়, প্রিয়জনের সান্নিধ্য পেতে পায় আর এতে সে জয়লাভও করে। আমাদের চতুর্পাশেও ঝড়ের আদলে গড়ে উঠেছে কিছু কীট। এরা সব কিছু ভেঙে চুরমার করতে চায়। কড়ায়ত্ব করতে চায় যতটা সে পারে। থেমে যাওয়া তাকে মানায় না। বিশ্ব কবির ‘দুই বিঘা জমি’র ‘পেলে দুই বিঘে প্রস্থে ও দিঘে সমান হইবে টানা’ এই চরণটি তারা লালন করে, ধারণ করে এবং মেনে চলতে চায়। তারা উপেনের কষ্ট বুঝতে চায় না। জীবনানন্দ দাশ ব্রজমোহন স্কুলে পড়েছেন। শহীদ আলতাফ মাহমুদ বরিশাল জিলা স্কুলে পড়েছেন। সুন্দর বিষয়টি হলো দু’জনেই ব্রজমোহন কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। অনেক বলাবলি, লেখালেখির পর ব্রজমোহন কলেজ কর্তৃপক্ষ জীবনানন্দ দাশকে ঘিরে কিছু কার্যক্রম শুরু করেছে। ব্রজমোহন বিদ্যালয় এখনো নিশ্চুপ। কর্তৃপক্ষ হয়তো মনে করে জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে তাদের কোন দায় নেই। দায় অনুভব করাকে আমি যোগ্যতার মাপকাঠিতে ফেলতে চাই। যোগ্যতা না থাকলে দায় অনুভব অনুপস্থিত থাকে। আবার এটাও দেখেছি, দেরিতে হলেও কারো কারো দায় অনুভূত হয়। আগামী ২৩ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা অমর সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদের ৮৬ তম জন্মদিন। তাঁর মৃত্যুদিন সম্পর্কে আমরা কেহই নিশ্চিত নই। ৩০ আগস্ট ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বর্বর পাকিস্তানী সৈন্যরা ঢাকার আউটার সার্কুলার রোডের বাসা থেকে তাকে হাত এবং চোখ বেঁধে নিয়ে যায়। আলতাফ মাহমুদ আজ পর্যন্ত আমাদের মাঝে আর ফিরে আসেন নি। জনশ্রুতি রয়েছে ১লা সেপ্টেম্বরও তাকে জীবিত অবস্থায় দেখা গেছে। অদম্য সাহসী এই মানুষটি জীবন দিয়েছেন দেশের জন্য, আমাদের জন্য। তাঁর জীবন দান এবং আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি গানে সুরারোপ আমাদেরকে উজ্জীবিত করে, অন্ধকার থেকে আলোর পথে যেতে প্রেরণা যোগায়। তার আদর্শকে লালনের মধ্য দিয়ে শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মেরুদন্ড সোজা করে তর্জনী উঁচিয়ে এখনই বলার সময় – ফাট শালা, হাঁটুর নিচে পেটাবো। বরিশালের হাসপাতাল রোডে শহীদ আলতাফ মাহমুদের নামে একটি বিদ্যালয় রয়েছে। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়টির কার্যক্রম সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা এবং শহীদ আলতাফ মাহমুদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসন ১৯৮৪ ও ৮৫ সনে ‘শহীদ আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যালয়’ এর নামে জমি বরাদ্দ দেয়। সেই থেকে আজ অবধি সেখানেই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সঙ্গীত বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের কার্যক্রমে আরও গতিশীলতা এনে শহীদ আলতাফ মাহমুদের আদর্শ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে এটাই প্রত্যাশা। দেশের জন্য তাঁর অবদান এবং শোষক শ্রেণির প্রতি তার যে চরম ঘৃণা নতুন প্রজন্মের মাঝে আমাদেরই তা তুলে ধরা উচিত। সবশেষ যে কথাটা বলা একান্তই দরকার তা হলো, শহীদ আলতাফ মাহমুদ আমাদের শহরের মানুষ, আমাদের মানুষ। তাঁকে সীমাহীন উচ্চতায় আসীন করতে আমি ছাড়া কে আর দায়ভার নেবে ? জায়গা জমি যদি কারো কারো কাছে সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয় তবে শহীদ আলতাফ মাহমুদ আমার কাছে অমূল্য সম্পদ-এ আমার বোধের উপলব্ধি।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
 
Website Design and Developed By Engineer BD Network