২রা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার

উপকূলে নভেম্বর মাসেই ১১টি মারাত্মক ঘূর্ণিঝড়

আপডেট: নভেম্বর ১২, ২০১৯

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

বরগুনা প্রতিনিধি:

বঙ্গপসাগরের কোল ঘেষে গড়ে ওঠা উপকূলীয় জেলা বরগুনার বিষখালী ও বলেশ্বর নদির মোহনায় গড়ে ওঠা উপজেলা বেতাগী। একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ে চরম আতঙ্কে বিষখালী নদী পাড়ের মানুষ। বিভিন্ন সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে লন্ডপন্ড করে দেয় উপকূলের বিস্তির্ণ জনপদ।

জানা যায়, ১৯০৪ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১১৫বছরে বাংলাদেশের উপক‚লীয় অঞ্চলের ওপর শুধু নভেম্বর মাসেই মোট ১১টি মারাত্মক ঘুর্ণিঝড় আঘাত হানে। যার ফলে ব্যাপক প্রাণহানি, বন্য ও গৃহপালিত পশুর মৃত্যু ও সম্পদহানি ঘটে। এর মধ্যে গতকালের ‘বুলবুল’ নামক ঘূর্ণিঝড়ের তথ্যেও বেশ আতঙ্কিত ছিলো উপকূলীয় অঞ্চলের লোকজন। তাই উপক‚লবাসীর মধ্যে নভেম্বর আলাদা একটি আতঙ্কের মাস।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের (সিডিএমপি) দুর্যোগ কোষ থেকে বিগত বছরগুলোর মধ্যে শুধু নভেম্বর মাসের সংগঠিত ঘ‚র্ণিঝড় গুলো হচ্ছে,

সাল ১৯০৪ নভেম্বর:

সোনাদিয়ার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া ঘ‚র্ণিঝড়ে ১৪৩ জনের মৃত্যু এবং বহু মাছ ধরার নৌকা ধ্বংস হয়। সেই সাথে বিষখালি নদিতে বিলীন হয় অর্ধশত বসতবাড়ি।

সাল ১৯৭০ হারিকেন (১১-১৩ নভেম্বর):

সারাদেশের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সর্বাপেক্ষা বেশি প্রাণহানী ও সম্পদ বিনষ্টকারী ধ্বংসাত্মক ঘূর্র্ণিঝড় সংগঠিত হয়। হারিকেনের তীব্রতা নিয়ে প্রচন্ড বাতাস দু’দিন ধরে বার বার আঘাত হানে চট্টগ্রামে এবং সেই সঙ্গে বরগুনার বেতাগী সহ পার্শ্ববর্তি উপজেলা সহ জেলা শহরেও ব্যাপক তান্ডপ চলে। প্রাকৃতিক এই দূযোর্গে সর্বাপেক্ষা মারাত্মক প্রানহানী, সম্পদ ও ফসলের ধ্বংস সাধন হয়। সারাদেশের সরকারি হিসেব অনুযায়ী দূর্যোগ আক্রমনিত জেলা ও উপজেলা গুলোতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিলো এবং ৩৫হাজার হাজার সমুদ্র নির্ভর মৎস্যজীবী ও ৭২ হাজার অভ্যন্তরীণ মৎস্যজীবী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আরো জানা যায়, উপকূল সহ সারাদেশে এর মধ্যে ৪০ হাজারের ও বেশি অভ্যন্তরীণ মৎস্যজীবী ঘূর্র্ণিঝড় চলাকালে সমুদ্র ও বড় নদিতে মাছ ধরার সময় মৃত্যু বরণ করে। মোট ২০ হাজার এর অধিক মাছ ধরার নৌকা ধ্বংস হয়। সম্পদ ও ফসলের ক্ষতির পরিমাণও ছিলো বেশ। লাখ লাখ গবাদি পশুর মৃত্যু হয়, চার লাখ ঘরবাড়ি এবং তিন হাজারের ও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সমুদ্রে ভরা জোয়ারের সময় ঘুর্ণিঝড়টি সংগঠিত হওয়ায় এমন প্রলয়ংকরী জলোচ্ছাসের সৃষ্টি হয়েছিলো। হারিকেন নামক এই ঘ‚র্ণিঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিলো ঘণ্টায় ২২২ কিলোমিটার এবং জলোচ্ছাসের সর্বোচ্চ উচ্চতা ছিলো প্রায় ১০.৬ মি.।

সাল ১৯৭১ (৫-৬ নভেম্বর):

চট্টগ্রামের উপকূলবর্তি অঞ্চলে তীব্র ঘ‚র্ণিঝড় আঘাত হানে। মানুষ ও গবাদি পশুর প্রাণহানি ঘটে (ক্ষয় ক্ষতির বিবরণ পাওয়া যায়নি)। বেতাগীর চরখালি ও মাছুয়াখালীতে ব্যাপক গবাদি পশু মারা যায়। তবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন এই সময়ের ঘূণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

সাল ১৯৭১ (২৮-৩০ নভেম্বর):

বরগুনা জেলাসহ সুন্দরবনের উপক‚লীয় অঞ্চলে ঘণ্টায় ৯৫-১১৩ কি.মি. বায়ু প্রবাহ ও ১-২ মি. কম উচ্চতার জলোচ্ছাসসহ ঘুর্ণিঝড় সংগঠিত হয়। এছাড়াও সমগ্র খুলনা অঞ্চলে ঝড়ো আবহাওয়া বিরাজ করে এবং খুলনা শহরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়।

সাল ১৯৭৪ (২৪-২৮ নভেম্বর):

বরগুনা জেলার পাশ্ববর্তি সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা, এবং কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চল এবং সমুদ্র তীরবর্তি দ্বীপ সমূহে ঘণ্টায় ১৬১ কি.মি. বেগে বায়ু প্রবাহসহ তীব্র ঘ‚র্ণিঝড় ও ৩-৫.২ মিটার উঁচু জলোচ্ছাস আঘাত হানে। প্রায় ২শতাধিক মানুষ ও প্রায় ১ হাজার গবাদি পশুর মৃত্যু হয় এবং ২ হাজারের ও বেশি ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়।

সাল ১৯৮৩ (৫-৬ নভেম্বর):

প্রতি ঘণ্টায় ১৩৬ কি.মি. বেগে বায়ু প্রবাহ ও ২মিটার উঁচু জলোচ্ছাস সহ তীব্র ঘূর্ণিঝড় বেতাগী, বরগুনা,বরিশাল ও পটুয়াখালীর সহ কক্সবাজার উপক‚ল ও সেন্টমার্টিন দ্বীপের নিম্নাঞ্চলের দিকের উপর দিয়ে বয়ে যায়। অর্ধশত নৌকা ও তিন শতাধিক মৎস্যজীবী নিখোঁজ হয় একইসাথে ধ্বংস হয় দুই হাজার বসতবাড়ি ।

সাল ১৯৮৬ (৮-৯ নভেম্বর):

উপক‚লীয় অঞ্চল বরগুনা, বেতাগী বরিশাল, পটুয়াখালী সহ চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর চরাঞ্চল ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পরে। ঘূণিঝড়ে বাতাসের গতিবেগ ছিলো প্রতিঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১১০ কি.মি. এবং খুলনায় ৯০ কি.মি. বরিশালে ৮০ কি,মি। এতে ১৪ ব্যক্তি নিহত হয় এবং ৯৭ হাজার ২শ হেক্টর ফসলি জমি বিনষ্ট হয়।

সাল ১৯৮৮ (২৪-৩০ নভেম্বর):

বরিশালের চরাঞ্চল সহ যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর উপকূলবর্তি দ্বীপসমূহ এবং খুলনার উপর দিয়ে ঘণ্টায় ১৬২ কি.মি. বেগে বায়ু প্রবাহসহ তীব্র ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। মংলায় চার থেকে পাঁচ মিটার উঁচু জলোচ্ছাস হয়। এতে ৫ হাজার ৭০৮ ব্যক্তি নিহত হয় এবং ৬৫ হাজার গবাদি পশু মারা যায়। বহু সংখ্যক বন্য পশু মারা যায়। তার মধ্যে ছিলো হরিণ ১৫ হাজার ও রয়েল বেঙ্গল টাইগার ৯টি এবং ফসল বিনষ্ট হয় প্রায় শত কোটি টাকার।

সাল ১৯৯৫ (২১-২৫ নভেম্বর):

উপকূলবর্তি দ্বীপ সমূহে এবং কক্সবাজারের চরাঞ্চলে ঘণ্টায় ২১০ কি.মি. বেগে বায়ু প্রবাহসহ তীব্র ঘুর্ণিঝড় আঘাত হানে। প্রায় ৬৫০ জনের মৃত্যু ও ১৭ হাজার গবাদি পশুর প্রাণহানি ঘটে। একইসাথে বরগুনার উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রে যাওয়া জেলে নিখোঁজ সহ ব্যাপক সম্পদ বিনষ্ট হয়।

সাল২০০৭ সিডর(১৫ নভেম্বর):প্রলঙ্করকারী সুপার সাইক্লোন

ঠিক ১২ বছর পূর্বে বাংলাদেশের উপক‚লীয় এলাকায় সুপার সাইক্লোন সিডর আঘাত হানে ২০০৭সালের ১৫ই নভেম্বের রোজ বৃহস্পতিবার। এক যুগ অতিক্রম হলেও সেই আতঙ্ক এখনো ভূলতে পারেনি উপকূলের মানুষ। বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী বরগুনা,বেতাগী, পাথরঘাটা, পটুয়াখালী, বাগেরহাট সহ পিরোজপুর জেলা এই সুপার সাইক্লোন সিডরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত অন্যন্য জেলাগুলো হচ্ছে, ঝালকাঠি, বরিশাল ও ভোলা, সাতক্ষীরা, খুলনা, গোপালগঞ্জ, মাদারিপুর, শরিতপুর। সরকারি হিসেব অনুযায়ী সাইক্লোন সিডরের কারণে সারাদেশে ৩ হাজার ৪০৬ জন লোক নিহত হয়, নিখোঁজ হয় ১ হাজার ৩জন, মারাত্মক আহত হয় ৫৫ হাজার মানুষ । তবে বে-সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরো বেশি। ধ্বংস হয় ৯ লাখ ৬৮ হাজার ঘরবাড়ি, দুই লাখ দশ হাজার হেক্টর জমির ফসল। মারা যায় সুন্দরবনের বিপুল সংখক প্রাণী। সিডরের তান্ডপে বেতাগীতে বেড়িবাঁধ ভেঙে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের প্রায় প্রায় অর্ধশত গ্রাম। এ সময় সদর ও লক্ষিপুরায় ঘরবাড়ি এবং গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়।মোকামিয়া , চরখ , মাছুয়াখালিতে ব্যাপক সম্পদহানী হয়, বিনষ্ট হয় ঘরবাড়ি। কিন্তু সাধারণ মানুষের আজও ক্ষোভ সিডরের পর দীর্ঘসময় অতিক্রম হলেও সংস্কার হয়নি বিষখালী নদী তীরবর্তী এলাকার বেড়িবাঁধটি। পাশাপাশি এসব এলাকায় নির্মাণ হয়নি পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার। এখনো একের পর এক দুর্যোগের কথা শুনলেই আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করেন উপক‚লবাসী।

সাল ২০১৯ (৯ নভেম্বর):আলোচিত ঘূণিূঝড়‘বুলবুল’

৯ নভেম্বর থেকে আলোচিত ঘুর্ণিঝড়ে উপকূলীয় জেলা বরগুনা সহ বেতাগীতে তেমন কোন ধরনের মারাতœক দূর্ঘটনার সন্ধান পাওয়া না গেলেও বিগত দিন গুলো স্মৃতিচারণ করে আতঙ্কিত ছিলো বিষখালি নদী পাড়ের মানুষ। এদিকে ঘূণিঝড় মোকাবেলায় বেতাগী উপজেলা প্রশাসন সহ নানা ধরণের সহযোগী সংগঠনের ছিলো সর্তকতামূলক নানা ব্যবস্থপনা। উপজেলার ১টি পৌরসভা সহ ৭টি ইউনিয়নে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে আসা জনসাধারণের জন্য ছিলো শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
   
Website Design and Developed By Engineer BD Network