৫ই মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, শুক্রবার

 

উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ‘জ্যোৎস্না উৎসব’ বরিশালে আজ

আপডেট: ডিসেম্বর ১২, ২০১৯

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

বরিশাল বিভাগের বরগুনার তালতলীর নলবুনিয়া শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকতে উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ জ্যোৎস্না উৎসব হবে আজ বৃহস্পতিবার। বরগুনা জেলা প্রশাসক পঞ্চমবারের মতো এ জ্যোৎস্না উৎসবের আয়োজন করেছেন। বরগুনার প্রধান তিনটি নদী– পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর মোহনায় নবগঠিত তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের স্নিগ্ধ বেলাভূমিতে জেগে ওঠা চরের নাম রাখা হয়েছে ‘শুভসন্ধ্যা’।

অন্যদিকে দীর্ঘ ঝাউবন, তিন তিনটি নদীর বিশাল জলমোহনা। সব মিলিয়ে নদ-নদী আর বন-বনানীর এক অপরূপ সমাহার– শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত! সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এক বিশাল ঝাউবন। দক্ষিণের খোলা বাতাস ঝাউবন স্পর্শ করে যাচ্ছে পরম আবেশে।

খোলা বাতাসের ছোঁয়ায় উড়ন্ত চুলের মতো দুলছে ওই ঝাউগাছগুলোর ডালপালা। জন্ম থেকেই সমুদ্রের খোলা বাতাস গায়ে মেখে ঝাউগাছগুলো এখন অনেক বড় হয়ে উঠেছে। সমুদ্রের আছড়ে পড়া ঢেউ আর ঝাউগাছের মাঝখানে শূন্য বালুরাশি। দৃষ্টিনন্দন এক সমুদ্রসৈকত! সমুদ্রের মৃদু ঢেউ, বালুময় দীর্ঘ সৈকত আর ঝাউবনের সবুজ সমীরণের এ দৃশ্যটি প্রকৃতি প্রেমের একটি উদাহরণ। এই প্রেমময় দৃশ্যপটের নাম-শুভসন্ধ্যা। দক্ষিণে তাকালে অথৈ সাগরের ঢেউ আর ঢেউয়ের সঙ্গে দোল খেলা মাছ ধরার ট্রলার ব্যতীত আর কিছুই দেখা যাবে না।

প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটিয়ে পূর্ণিমার চাঁদের পানে তাকিয়ে জ্যোৎস্না উৎসব পালিত হবে আজ। হেমন্তের শিশিরে নগ্ন পায়ে হাঁটার স্মৃতি অনেকেই হয়তো ভুলে গেছেন! মোম- জ্যোৎস্নায় চোখ-মন ভরানো হয় না কতকাল তা আপনার চেয়ে ভালো আর কে জানে! তাই তো এই আয়োজন, ‘জ্যোৎস্না উৎসব’। ত্রিমোহনার রুপালি জলরাশি ঘেঁষে বিস্তীর্ণ সৈকতে বসে হৈমন্তী পূর্ণিমা দেখে আপনি শিহরিত হবেনই। জ্যোৎস্নাপাগল হাজারো মানুষের সঙ্গে গান, কবিতা, পুঁথি, পুতুল নাচ, জাদু প্রদর্শনী, যাত্রাপালা, হয়লা গান, নৃত্য, ফানুস ওড়ানো দেখে আপনাকে মুগ্ধ হতেই হবে। আগামীকালের পূর্ণিমায় এখানেই জলজ্যোৎস্নায় একাকার হবে জ্যোৎস্নাবিলাসী হাজারো মানুষ।

অভিজ্ঞতা আর স্মৃতিকে সমৃদ্ধ করতে প্রিয় স্বজনদের নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন তালতলীর শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকতের জ্যোৎস্না উৎসবে। মুজিববর্ষ উপলক্ষে তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের স্নিগ্ধ বেলাভূমি শুভসন্ধ্যার বিস্তীর্ণ বালুচরে পঞ্চমবারের মতো এ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এ উৎসব ঘিরে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বরগুনা জেলা প্রশাসন। পর্যটনশিল্পের অপার সম্ভাবনাময় বরগুনার নয়নাভিরাম সৌন্দর্যকে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে এ উৎসবে যোগ করা হয়েছে নানা আয়োজন। উৎসব ঘিরে ইতোমধ্যে শুভসন্ধ্যা সৈকতকে অপরূপ শয্যায় সাজানো হয়েছে; শুরু হয়েছে বাহারি পণ্যের পসরা। যাওয়া-আসার বিভিন্ন সড়কে তৈরি করা হয়েছে অসংখ্য আলোকসজ্জাসংবলিত তোরণ।

নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা করেছে প্রশাসন। শুভসন্ধ্যায় দেখা যাবে– সাগরপাড়ে সবুজের সমারোহে বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও পাখির কুহু কুহু কলতান। মৃদু ঢেউয়ের ভালোবাসা পায়ে লাগিয়ে, স্নিগ্ধ বাতাস গায়ে লাগিয়ে, এখানে দাঁড়িয়ে গোধূলি সন্ধ্যায় দেখা যাবে সূর্যাস্ত। শুভসন্ধ্যার পাশেই আশারচরের অবস্থান। অসংখ্য মৎস্যজীবীর বসবাসসহ শুঁটকিপল্লী রয়েছে এই চরে। আবার শীতের মৌসুমে পর্যটকরা দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, গভীর অরণ্য ও বিশাল শুঁটকিপল্লী দেখতে যান এ আশারচরে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে যাওয়া মানুষ শুঁটকি উৎপাদনের জন্য চরটিতে ঘর বাঁধে।

বছরে সাত থেকে আট মাস থাকে শুঁটকি উৎপাদনের ব্যস্ততা। আশারচরের কাছেই রয়েছে তালতলীর বিশাল রাখাইন পল্লী। বঙ্গোপসাগরের তীরে এ পল্লী কুপিবাতি জ্বালিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলে তাঁতে কাপড় বোনার কাজ। তাঁতশিল্প ছাড়াও রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধমন্দিরও অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ হতে পারে। আশারচরের শুঁটকিপল্লী, টেংরাগিরি ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, সোনাকাটা ইকোপার্কের হরিণসহ বন্যপ্রাণী ইত্যাদি দেখার পাশাপাশি দেখা মেলে মৎসজীবীদের কর্মব্যস্ততা আর সৈকতের বুকে স্থানীয় শিশুদের উচ্ছ্বাস।

এখানে নদী সমুদ্রের তাজা মাছ পাওয়া যায় ফকিরহাট বাজারের ছোট ছোট খাবারের হোটেলগুলোতে, যা পর্যটকদের পেট ভরাবে। এখানে খুব অল্প টাকায় খাওয়া যাবে মাছ-ভাত বা গ্রামীণ স্থানীয় সব খাবার। এই সৈকতটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে নবীন বিবেচনায় খাবার ও মাছের দাম তুলনামূলক সস্তা।

যেভাবে যাবেন শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকতে

জ্যোৎস্না উৎসবের জন্য নলবুনিয়া শুভসন্ধ্যার উদ্দেশে বরগুনা থেকে একাধিক লঞ্চ ছেড়ে যাবে ১২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায়। কেবিন ভাড়া সিঙ্গেল ১২০০, ডাবল ২০০০, ডেক ৩০০ (আসা-যাওয়া) বরগুনা থেকে ‘শুভসন্ধ্যা’ যেতে সময় লাগবে কমবেশি আড়াই ঘণ্টা। বরগুনার নদীবন্দর (লঞ্চঘাট) থেকে বেলা ১১টায় তালতলীর শুভসন্ধ্যা সৈকতের উদ্দেশ্যে দুটি ও আমতলী লঞ্চঘাট থেকে একটি দোতলা লঞ্চ ছেড়ে যাবে। দুপুরে লঞ্চযাত্রীদের জন্য রয়েছে খিচুড়ির ব্যবস্থা। লঞ্চে কেবিন না পেলেও কোনো সমস্যা নেই। সঙ্গে মাদুর আর বিছানার চাদর আনলে আপনি কেবিনের চেয়ে অনেক বেশি সাচ্ছন্দ্যে যেতে পারবেন। দলবেঁধে আড্ডা আর কোরাস গানের সঙ্গে সঙ্গে আপনি মাত্র আড়াই ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাবেন শুভসন্ধ্যার স্নিগ্ধ সৈকতে। সড়কপথেও যাওয়া যাবে শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকতে।

১. সড়কপথে বাস/মোটরবাইকে গোলবুনিয়া, চালতাতলী, লতাকাটা হয়ে ট্রলারযোগে তালতলী।

২. তালতলী থেকে ভাড়ায়চালিত মোটরবাইকে নলবুনিয়া ‘শুভসন্ধ্যা’ সৈকত (ভাড়া জনপ্রতি ৫০/-টাকা)। পটুয়াখালী থেকে যেতে পারবেন বাসযোগে সরাসরি তালতলী, ভাড়া-১৫০ টাকা। বরিশাল থেকে যেতে পারবেন রূপাতলী বাসস্ট্যান্ড হয়ে বাসযোগে সরাসরি তালতলী, ভাড়া-২০০ টাকা। ঢাকা থেকে যেতে পারবেন গাবতলী এবং সায়েদাবাদ থেকে সরাসরি বরগুনার উদ্দেশ্যে– সকাল ও বিকালে বাস ছেড়ে আসে। ভাড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। এ ছাড়া ঢাকা সদরঘাট থেকে প্রতিদিন বিকাল ৫টায় এবং ৬টায় দুটি দোতলা লঞ্চ ছেড়ে আসে।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
 
Website Design and Developed By Engineer BD Network