২৪শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার

শিরোনাম
তেলবাহী লড়ি উল্টে গিয়ে আগুন লেগে এক জনের মৃত্যু। ভূমি বিষয়ক তথ্যাদি স্কুলের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করো হয়েছে-ভূমিমন্ত্রী মির্জা ফকরুলরা তারেক জিয়ার নির্দেশে জনগনের সাথে প্রতারনা ও তামশা করছে-আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিগ বার্ড ইন কেইজ: ২৫ শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার  ঢাবি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে ১ কোটি টাকার বৃত্তি ফান্ড গঠিত হাইকোর্টের রায়ে ডিন পদে নিয়োগ পেলেন যবিপ্রবির ড. শিরিন জয় সেট সেন্টার’ থেকে মিলবে প্রশিক্ষণ, বাড়বে কর্মসংস্থান: পীরগঞ্জে স্পীকার বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস আগামীকাল টুঙ্গিপাড়ায় যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী, সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন বিশিষ্ট রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী সাদি মোহম্মদ আর নেই

যত সম্পত্তির মালিক পাপিয়া

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২০

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়া চৌধুরী পিউ ও তার স্বামী মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমন ওরফে মতি সুমনের নাম এখন সবার মুখে মুখে।

রাজনীতির আড়ালে অস্ত্র, মাদক ও দেহব্যবসা করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে এই দম্পতি।

গ্রেফতারের পর পাপিয়ার মোবাইল ফোন তদন্ত করেছে আইনশৃংখলা বাহিনী। তার ফোনটি অশ্লীল ভিডিওতে ঠাসা।

এসব ভিডিওতে সুন্দরী তরুণীদের সঙ্গে উঠতি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী ছাড়াও আমলা এবং কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার অশ্লীল ছবি রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, রাজনীতির আড়ালে মাদক ও নারীদের নিয়ে ‘বাণিজ্য’ করতেন পাপিয়া। রাজধানীর তারকা হোটেলগুলোয় মাঝেমধ্যেই ‘ককটেল পার্টি’র আয়োজন করতেন। এসব পার্টিতে উপস্থিত হতেন সমাজের উচ্চস্তরের লোকজন। মদের পাশাপাশি পার্টিতে উপস্থিত থাকত উঠতি বয়সী সুন্দরী তরুণীরা।

মদের নেশায় টালমাটাল আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে কৌশলে ধারণ করা হতো ওই তরুণীদের অশ্লীল ভিডিও।

পরে ওইসব ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করতেন পাপিয়া। বনিবনা না হলেই ফেসবুকে ছড়িয়েও দেয়া হত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই পাপিয়ার কাছ থেকে বেরিয়ে আসছে একের পর এক মাথা ঘুরিয়ে দেয়া খবর। পাপিয়ার অপকর্মের সঙ্গীদের ধরতে এরই মধ্যে একাধিক অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযান চলছে।

রোববার রাজধানীর ফার্মগেটে ইন্দিরা রোডে পাপিয়ার বাসায় অভিযান চালিয়ে ১টি বিদেশি পিস্তল, ২টি ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড গুলি, ৫ বোতল বিদেশি মদ, ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, ৫টি পাসপোর্ট, ৩টি চেক, বেশকিছু বিদেশি মুদ্রা ও বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি এটিএম কার্ড উদ্ধার করা হয়।

গ্রেফতারের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় বাইজি সর্দারনী বেশে পাপিয়ার অশ্লীল ভিডিও।

ইতিমধ্যে তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কথা বের হতে শুরু করছে। মুখ খুলতে শুরু করেছেন সাধারণ মানুষ।

সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, পতিতা ব্যবসার পাশাপাশি ব্ল্যাকমেইল করে পাপিয়া ও তার স্বামী গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। অনৈতিক কার্যকলাপের ভিডিও ধারণ করে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতেন তারা।

অপরাধে জড়িয়ে পড়া পাপিয়াকে ইতোমধ্যে সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন পাপিয়ার পাপের শাস্তি তাকে বহিষ্কারের মধ্যেই সীমিত থাকবে না। তার বিচার রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, হবে অপরাধ বিবেচনায়।

র‌্যাব-১ অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফী উল্লাহ বুলবুল বলেন, চাকরিপ্রত্যাশী নারীদের দেহব্যবসায় বাধ্য করতেন শামীমা নূর পাপিয়া।

আর অনৈতিক কর্মের ভিডিও ধারণ করে ব্যবসায়ীদের ব্ল্যাকমেইল করতেন। এ দুই উপায়ে তিনি শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।

অস্ত্র ও মাদক মজুদের পাশাপাশি কিউঅ্যান্ডসি নামে ক্যাডার বাহিনীও গঠন করেছেন।

তিনি জানান, পুলিশের এসআই ও বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন পদে মানুষকে চাকরি দেয়ার কথা বলে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন।

শুধু তাই নয়, জমির দালালি, সিএনজি পাম্পের লাইসেন্স দেয়া, গ্যাসলাইন সংযোগের নামেও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তারা।

দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ রেখেছেন এই দম্পতি।

শাফী উল্লাহ বুলবুল আরও বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ফার্মগেটে পাপিয়ার দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, নরসিংদী শহরে দুটি ফ্ল্যাট, ২ কোটি টাকা মূল্যের দুটি প্লট, চারটি বিলাসবহুল গাড়ি এবং গাড়ি ব্যবসায় প্রায় দেড় কোটি টাকা বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে।

এছাড়া বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত থাকার কথা জানা গেছে।

র‌্যাবের দাবি, পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরী রেলওয়ে ও পুলিশে চাকরির প্রলোভনে ১১ লাখ টাকা, একটি কারখানায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়ার কথা বলে ৩৫ লাখ টাকা, একটি সিএনজি পাম্পের লাইসেন্স করে দেয়ার কথা বলে ২৯ লাখ টাকা নিয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এর বাইরে নরসিংদী এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করেছেন তারা।

র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক বলেন, পাপিয়ার আয়ের অন্যতম উৎস নারীদের দিয়ে জোরপূর্বক অনৈতিক কাজ করানো।

ঢাকার বিভিন্ন বিলাসবহুল হোটেলে কম বয়সী মেয়েদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করতেন তিনি।

যাদের অধিকাংশকে নরসিংদী এলাকা থেকে চাকরির প্রলোভনে ঢাকায় আনা হয়েছিল।

অনৈতিক কাজে বাধ্য না হলে তাদের নানাভাবে নির্যাতন করা হতো।

পাপিয়ার সঙ্গে বিশিষ্টজনদের ছবির বিষয়ে জানতে চাইলে ওই র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে যদি কেউ কারও সঙ্গে ছবি তুলতে চায় তাহলে বিষয়টি সাধারণত এড়ানো যায় না। তাই কারও সঙ্গে ছবি থাকা মানেই সখ্য নয়।

র‌্যাব জানায়, যুবলীগ নেত্রী পাপিয়া পিউ নামেই বেশি পরিচিত। এই নেত্রীর প্রকাশ্য আয়ের উৎস গাড়ি বিক্রি ও সার্ভিসিংয়ের ব্যবসা।

এর আড়ালে জাল মুদ্রা সরবরাহ, বিদেশে অর্থপাচার এবং অবৈধ অস্ত্র রাখাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব অভিযোগের অনুসন্ধান করছিল র‌্যাবের একটি দল।

বিষয়টি আঁচ করতে পেরে শনিবার সকালে তড়িঘড়ি করে দেশত্যাগের চেষ্টা করেন পাপিয়া। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। সহযোগীসহ গ্রেফতার হন তিনি।

র‌্যাব কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফীউল্লাহ বুলবুল বলেন, গাড়ির ব্যবসার আড়ালে তিনি অবৈধ অস্ত্র, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত।

সমাজসেবার নামে তিনি নরসিংদীর অসহায় নারীদের অনৈতিক কাজে লিপ্ত করে আসছিলেন।

তিনি গুলশানের একটি অভিজাত হোটেলের প্রেসিডেন্ট স্যুট নিজের নামে বুক করে নানা ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ চালিয়ে আসছিলেন।

র‌্যাব জানায়, পাপিয়ার স্বামীর থাইল্যান্ডে বারের ব্যবসা রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অস্ত্র-মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন।

তিনি স্ত্রীর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসহায় নারীদের অনৈতিক কাজে ব্যবহার করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সালের দিকে নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমনের উত্থান শুরু।

শৈশব থেকেই চাঁদাবাজি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ব্ল্যাকমেইল ছিল সুমনের প্রধান পেশা।

চতুর সুমন রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন।

২০০১ সালে পৌরসভার কমিশনার মানিক মিয়াকে যাত্রা প্যান্ডেলে গিয়ে হত্যার পর তিনি আলোচনায় আসেন।

এরই মধ্যে পাপিয়া চৌধুরীকে বিয়ে করেন তিনি। এরপর তিনি স্ত্রী পাপিয়াকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করান।

২০১৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর জেলা যুব মহিলা লীগের সম্মেলনে তৌহিদা সরকার রুনা সভাপতি ও পাপিয়া চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

এদিকে অস্ত্র, মাদক ও জাল টাকা উদ্ধারের ৩ মামলায় পাপিয়া দম্পতির ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

সোমবার শুনানি শেষে ঢাকার দুই হাকিম আদালত আসামিদের রিমান্ডে পাঠান।

কোর্ট রিপোর্টার জানান, সোমবার দুপুরে আসামিদের সিএমএম আদালতে হাজির করা হয়। প্রথমে তাদের হাজাতখানায় রাখা হয়।

বিকাল সাড়ে ৩টায় তাদের এজলাসে তোলা হয়। পৌনে ৪টায় রিমান্ড শুনানি শুরু হয়।

প্রথমে বিমানবন্দর থানার জাল টাকা উদ্ধারে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরীসহ অপর দুই সহযোগী সাব্বির খন্দকার ও শেখ তাইবা নূরের ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

এর আগে শনিবার দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে দেশত্যাগের সময় পাপিয়া ও তার স্বামীসহ ৪ জনকে আটক করে র‌্যাব-১।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে র‌্যাব সদস্যরা ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডে পাপিয়া-মফিজুরের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে নগদ ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ, পাঁচটি পাসপোর্ট, তিনটি চেক বই, বিদেশি মুদ্রা ও বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি এটিএম কার্ড উদ্ধার করেন।

এ সময় বিদেশি পিস্তল এবং দুটি ম্যাগাজিনে ২০ রাউন্ড গুলিও উদ্ধার করা হয়। পাপিয়া ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে একাধিক মামলা করার পর পাপিয়ার পাপের সহযোগীদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাব।

র‌্যাবের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাল টাকা এবং নারীঘটিত কেলেঙ্কারির ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পাপিয়ার অজানা সব কাহিনী বেরিয়ে আসছে।

বিদেশে টাকা পাচারসহ ভয়ংকর সব অপরাধে জড়িত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই তাকে গ্রেফতার করা হয়। এসব ঘটনায় তার সঙ্গে আর কারা জড়িত জিজ্ঞাসাবাদে সে তথ্যও মিলেছে। অভিযান অব্যাহত আছে।

র‌্যাবের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সোমবার যুগান্তরকে বলেছেন, রাজধানীর তেজগাঁওয়ে এফডিসি গেট সংলগ্ন এলাকায় পাপিয়ার যৌথ মালিকানাধীন শোরুম ‘কার এক্সচেঞ্জ’ এবং নরসিংদীতে ‘কেএমসি কার ওয়াশ অ্যান্ড অটো সলুশন’ নামে গাড়ি সার্ভিসিং সেন্টার রয়েছে।

তবে এসব ব্যবসার আড়ালে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডই ছিল তার প্রধান কাজ।

অধিকাংশ সময়ই তিনি নরসিংদী ও ঢাকার বিলাসবহুল হোটেলে অবস্থান করতেন। চাঁদাবাজির জন্য নরসিংদীতে তার ক্যাডার বাহিনীও আছে।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
     
Website Design and Developed By Engineer BD Network