১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার

‘অশ্লীল’ শব্দের পক্ষে সাফাই গাইলেন তসলিমা!

আপডেট: মার্চ ৭, ২০২০

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

পশ্চিমবঙ্গে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বসন্তোৎসবে তরুণীদের খোলা পিঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান বিকৃত করে লেখা অশ্লীল শব্দের পক্ষে সাফাই গাইলেন বাংলাদেশের বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন।

তসলিমার স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে দেয়া হলো-

‘‘ইউটিউবে গাঁজা খেয়ে বেসুরো গান গায় গালিবাজ রোদ্দুর রায়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় তারও ভক্ত তৈরি হয়।

একটি চাঁদ উঠেছিল গগনের ভিডিওতে তো প্রায় ষাট লাখ লাইক পড়েছে।

এর নাম বাস্তবতা।

এর নাম আমাদের সময়, যে রকমই এই সময় হোক, এ আমাদের সময়।

এক সময় দেবব্রত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে রবীন্দ্র সঙ্গীত বিকৃত করার অভিযোগ উঠেছিল, সেই অভিযোগও আর নেই, সেই রক্ষণশীলতাও নেই, দেবব্রত বিশ্বাস বরং তার সব বিকৃতি নিয়েই আগের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়।

আজকাল রোদ্দুর রায় জাতীয় লোকেরা রবীন্দ্র সঙ্গীত বিকৃত করছে।

বিকৃত করাটাও কিন্ত এক ধরণের বাক স্বাধীনতা।

তার যা খুশি সে তা বলছে, যেভাবে গান গাইতে ইচ্ছে করে, সেভাবে গাইছে।

তার কিছু ভক্ত যদি শরীরে তার ফাজলামো ইতরামো এঁকে ঘোরাফেরা করে, তাতে কার কী ক্ষতি?

এইসব বাঁড়া, শালা, বাঞ্চোত শব্দগুলোকে, মূলত মানুষের তৈরি এবং ব্যবহৃত কোনো শব্দকেই রোদ্দুর রায় অশ্লীল বলে মনে করে না।

সে মনে করে দারিদ্র্য অশ্লীল, প্রতারণা অশ্লীল, ঘৃণা অশ্লীল,হত্যাকাণ্ড অশ্লীল, যুদ্ধ অশ্লীল।

অশ্লীলতা ব্যাপারটা তো আসলে আপেক্ষিক, একজনের কাছে যা অশ্লীল, আরেকজনের কাছে তা অশ্লীল নয়।

যে ভদ্রলোকেরা এই শব্দগুলোকে অশ্লীল বলছে তাদের অনেকে মনে মনে এইসব শব্দ বহুবার উচ্চারণ করে, অথবা এই শব্দগুলো তারা ঘরে বলে, বাইরে বলে না।

বাইরে নকল হলেও ঝলমলে একটা সমাজ তারা দেখতে চায়।

১০০ বছর আগে যেমন ভাবে মানুষ চলতো, যেমন ভাবে বলতো, তেমন ভাবে আজও চলুক বলুক চায়।

কিন্তু সমাজ তো বদলে যাচ্ছে, আগের মতো কেন থাকবে সবকিছু!

বদলের চাকা কিন্তু সবসময় ওপরের দিকে ওঠে না, নীচের দিকেও গড়ায়।

বদলটা মনের মতো না হলে কান্নাকাটি করার তো দরকার নেই।

বুঝতে হবে এই সমাজ এই মানসিকতা হঠাৎ আকাশ থেকে পড়েনি।

একেই আমরা সকলে মিলে একটু একটু করে তৈরি করেছি।

কলকাতার শাসকেরা তো বাংলা অন্ত প্রাণ নিরীহ নিরপরাধ তসলিমাকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে, ওই তাড়ানোর চেয়ে কি বাঁড়া শব্দটি বেশি অশ্লীল?

মানুষ এখনও অন্যায়ের ভেতর ততটা অশ্লীলতা দেখে না, যতটা দেখে দু’চারটা শব্দে, এবং অঙ্গভঙ্গিতে।

খুনোখুনিতে অশ্লীলতা দেখে না, যৌনসঙ্গমে দেখে।

রবীন্দ্রনাথের যুগে ছোটরা বড়দের চোখে তাকিয়ে কথা বলতো না, এখন ছোটরা বাপকেও বলে দেয়, ‘ফাক, হোয়াট বুলশিট আর ইউ টকিং ম্যান!

এসবকে যদি আমরা বিবর্তন বলি, আধুনিকতা বলি, স্মার্টনেস বলি, তবে মেয়েদের পিঠে হাস্যরসের জন্য লেখা ‘বাঁড়া চাঁদ উঠেছিল গগনে’ দেখলে আমরা আঁতকে উঠি কেন?

কে বলেছে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে হাস্যরস করা যাবে না?

ভগবানকে নিয়ে করা যায়, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যাবে না কেন?

যারা রবীন্দ্রনাথের দিকে কারোর ভেংচি কাটা বা কাদা ছোঁড়া দেখে বিচলিত হয়ে পড়ে, রবীন্দ্রনাথকে বর্ম পরাতে চায়, তারা তার উচ্চতা সম্পর্কে সম্ভবত কিছুই জানে না।

বাঙালিরা আমেরিকার সমাজে বাস করার জন্য বড় ব্যাকুল।

আমেরিকায় কি শুধু ডিগ্রি আর ডলারই ভেসে বেড়াচ্ছে, গালি ভাসছে না?

নতুন প্রজন্ম ‘ফাক’ শব্দটি ছাড়া ক’টা বাক্য বলে শুনি!

আমরা ছেলেমেয়েদের আমেরিকার স্বপ্ন দেখাবো, আমেরিকার ফিল্ম দেখাবো, হিপহপ শোনাবো, কিন্তু বাংলা সংস্কৃতিকে ভাল না বাসলে, বাংলা গানকে বিকৃত করলে, বা আমেরিকানদের মতো গালিগালাজ করলে কপাল থাপড়াবো, তা কেন?

চোখের জল মুছে ফেলে তার চেয়ে সন্তান সন্ততিদের এই শিক্ষা দিন ভাষা তার যাই হোক, কোনোদিন যেন প্রতারণা না করে, যেন কাউকে নির্যাতন না করে, যেন বর্বর না হয়, যেন লোভী না হয়, স্বার্থান্ধ না হয়।

জগত হয়তো এর চেয়ে বেশি কিছু কারও কাছ থেকে চায়ও না।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
   
Website Design and Developed By Engineer BD Network