৩১শে মার্চ, ২০২০ ইং, মঙ্গলবার

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ : এগিয়ে যাওয়ায় বাধা নিরাপত্তাহীনতা

আপডেট: মার্চ ৮, ২০২০

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

দেশে সব ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে নারী।

হাজারও বাধা উপেক্ষা করে, নিজ যোগ্যতায়।

কিন্তু সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নারীর ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন।

কর্মক্ষেত্র, চলার পথ, যানবাহন এমনকি নিজ ঘরেও তারা শিকার হচ্ছেন এসব নির্মমতার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা এর বিচারও পাচ্ছেন না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের ওপর এ নির্যাতন ঠেকানো গেলে, সব ক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হলে এবং নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে আরও এগিয়ে যাবে নারী।

এ অবস্থার মধ্যেই আজ বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রজন্ম হোক সমতার-সকল নারীর অধিকার।’

দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৬৯৭ নারী ধর্ষণ, ১৮২ জন গণধর্ষণ ও ৬৩ নারী ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হন।

পরের বছর ১ হাজার ৭০৩ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হন। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার ২৩৭ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৭৭ জনকে। ধর্ষণের ঘটনায় আত্মহত্যা করে ১৯ জন।

বছরটিতে ২৪৫ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হন ৪ হাজার ৬২২ নারী ও শিশু। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১১৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা ১১৮।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্যাতনের শুধু সংখ্যাই বাড়ছে না। হিংস্রতা ও বীভৎসতা বাড়ছে।

বাইরের মানুষের পাশাপাশি এমনকি স্বজনের হাতেও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নারী। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে।

ধর্ষণ-নির্যাতনের চিত্র ও ভিডিও মুঠোফোন ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে ইন্টারনেটে। প্রায় ৭০ ভাগ নারী বর্তমানে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে গণপরিবহনে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৫৯ নারী। এ সময়ে ১৬টি ধর্ষণ, ১২ গণধর্ষণ, ৯ ধর্ষণ চেষ্টা ও ১৫টি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে।

এ সংখ্যা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় উঠে আসা সংবাদের ভিত্তিতে। প্রকৃত ঘটনা এর চেয়ে বহুগুণ বেশি- বিচার পাবেন না এ শঙ্কায় অধিকাংশ নারী তা প্রকাশ করেননি।

এছাড়া গণপরিবহনে যাতায়াতকালে নারীরা অসম্মানজনক আচরণের শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই নারী যৌন নির্যাতনের শঙ্কায় গন্তব্যে পৌঁছার আগেই গণপরিবহন থেকে নেমে যান।

বেসরকারি সংগঠন একশন এইডের জরিপে উঠে এসেছে, গণপরিবহনে রাজধানীতে ৮৪ শতাংশ নারী আচরণ বা শারীরিকভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।

রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে দিনের বেলাতেই যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে নানারকম হেনস্তার শিকার হন নারী যাত্রীদের অধিকাংশ।

জরিপে পুরুষ যাত্রীদের হাতে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন ৪২ শতাংশ নারী যাত্রী। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ৫৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী জানান, প্রতি মুহূর্তে নারীর জন্য বাইরের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।

নারী কোথায় যাবে, কোন পোশাক পরবে, তা সমাজ নির্ধারণ করে দিতে চাচ্ছে। আর অপরাধীদের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে রাষ্ট্র, সমাজ থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যও।

জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে প্রতিরোধকারী সংস্থার সদস্য পর্যন্ত যৌন নির্যাতনে লিপ্ত হচ্ছে। ঘরে তো উঠতে-বসতেই নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, নির্যাতিতরাও তা মুখ ফুটে বলছে না।

আর বলতে গেলেই সেই অত্যাচার নির্যাতনের হার বাড়িয়ে দেয়া হয়। যারা আইনের আশ্রয় নিচ্ছে- তাদেরও ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়।

গণসাক্ষরতা অভিযানের পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, একটি স্বাধীন দেশে দিন বা রাতের কোনো সময়ই একজন নারী স্বাধীনভাবে চলতে পারছে না- এমন বর্বরতা কি কোনো উন্নয়ন দিয়ে ঢাকা সম্ভব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কেন শিক্ষার্থীরা যৌন নির্যাতনের ভয়ে থাকবে।

কর্মক্ষেত্রে নারীদের ভয় আরও বেশি। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সরকারকেই শক্ত অবস্থানে যেতে হবে। জঙ্গি নির্মূলে যেমন শক্ত অবস্থানে, তার চেয়ে বেশি শক্ত অবস্থানে যেতে হবে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে।

রাশেদা কে চৌধুরী নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরীকরণের ওপরও জোর দেন। তিনি বলেন, নারী ক্রিকেটারদের কী অবস্থা আর পুরুষ ক্রিকেটারদের কী অবস্থা!

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু জানান, দেশে নারীরা এগোচ্ছে- এটি নিশ্চয়ই অহঙ্কারের। কিন্তু যৌন নির্যাতন আর ধর্ষণের ঘটনা যে প্রতি বছর লাফিয়ে বাড়ছে- সেটি কোন অহঙ্কারের?

আমাদের সব অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে এমন বর্বরকাণ্ডে। তিনি নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, দেশে নারীদের কোনো নিরাপত্তা নেই। এখানে রাষ্ট্র, সরকার সমাজ চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।

যেখানে নারী ধর্ষণ নির্যাতনের শিকার হবে- সেখানে শুধু প্রশাসন নয়, সংসদ সদস্যসহ প্রতিটি পর্যায়ে থাকা জনপ্রতিনিধিদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ও কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক জানান, নারীর প্রতি সহিংস ক্ষেত্রের মধ্যে পরিবার ও সমাজ হচ্ছে সবচেয়ে ভয়ানক। নারীরা এগিয়ে যাক, প্রতিষ্ঠিত হোক- অনেক পরিবারই চায় না।

ফলে সমাজও নারীকে যথাযথভাবে দাঁড়াতে দেয় না। আর সহিংসতা নির্যাতন তো পরিবার-সমাজের মানুষরাই করছে। এজন্য পরিবার-সমাজকে নারীবান্ধব হতে হবে। নতুবা পরিবার-সমাজ থেকে সভ্য মানুষ বের হবে না।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক এবং বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোহিত কামাল বলেন, মানুষের মধ্যে যদি হিংস তা থাকে, বর্বরতা থাকে তাহলে নারীর প্রতি নির্যাতন বাড়বেই।

গণমাধ্যম বা মামলায় যেসব ধর্ষণ-নির্যাতনের ঘটনা আসছে- বহু ঘটনা তারও আড়ালে থেকে যাচ্ছে। শত শত ঘটনা আসছে আমার কাছে, যারা দিনের পর দিন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক জানান, এর প্রতিকার-প্রতিরোধ শুধু আইন দিয়ে সম্ভব নয়। তবে এটা নিশ্চিত আইনের বাস্তবায়ন হচ্ছে না। নির্যাতন মামলায় মাত্র ২ শতাংশ অপরাধীর বিচার হচ্ছে।

এভাবে এমন বর্বর ঘটনা কি করে রোধ করা সম্ভব। কেন হচ্ছে, কোথায় হচ্ছে, কারা করছে- এর কোনো খোঁজ নেয়া হচ্ছে না।

কোন পদ্ধতিতে এর প্রতিরোধ হবে- এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো মাথাব্যথা নেই।

শুরুতেই সমস্যাটি বুঝতে হবে- যা এখনও নির্ণয় করা হয়নি।

দ্বিতীয়ত, নারীকে যতদিন ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখা হবে, নারীর প্রতি দৃষ্টি পরিবর্তন না হবে- ততদিন এমন বর্বরতা কমবে না।

নারী দিবসের কর্মসূচি : মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় আজ সকাল ১০টায় রাজধানীর ওসমানী মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনের মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

এতে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

অনুষ্ঠানে আলোচনা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ডকুমেন্টারি প্রদর্শন ও জাতীয় পর্যায়ে ৫ জন শ্রেষ্ঠ জয়িতাকে সম্মাননা দেয়া হবে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বিকাল সাড়ে ৩টায় সংস্থার মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।

বিকাল সাড়ে ৪টায় শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের উদ্যোগে নির্যাতন বিরোধী মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হবে।

দিবসটি উপলক্ষে ১৬ থেকে ১৮ মার্চ দেশজুড়ে নারী উন্নয়ন মেলা আয়োজন করা হবে।

এছাড়া বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
Website Design and Developed By Engineer BD Network