২৮শে মে, ২০২০ ইং, বৃহস্পতিবার

 

গাজীপুরে ৪ খুন-ধর্ষণের নেপথ্যে ২০-২২ লাখ টাকা

আপডেট: এপ্রিল ৩০, ২০২০

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকায় মা, দুই মেয়ে ও এক প্রতিবন্ধী ছেলেকে হত্যা এবং একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনার মামলায় আরো পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

গ্রেপ্তারকৃতরা কয়েক দিন আগে জানতে পারে, কাজল (গৃহকর্তা) মালয়েশিয়া থেকে হুন্ডির মাধ্যমে প্রায় ২০-২২ লাখ টাকা পাঠিয়েছেন।

ঘটনার পাঁচ-সাত দিন আগে কাজিম ও হানিফ ওই বাড়িতে ডাকাতির পরিকল্পনা করে।

নিহতদের বাড়ি থেকে লুট হওয়া স্বর্ণালংকার, টাকা ও আসামিদের রক্তমাখা জামাকাপড় উদ্ধার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলো কাজিম উদ্দিন (৫০), হানিফ (৩২), বশির (২৬), হেলাল (৩০) ও এলাহি মিয়া (৩৫)। র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, গত মঙ্গলবার দুপুর ১টা থেকে গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানার বিভিন্ন এলাকায় র‌্যাব-১ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই মাদকসেবী।

কাজিম উদ্দিন রিকশাচালক, হানিফ শ্রমিক, বশির অটোরিকশাচালক, হেলাল পেশায় ভাঙ্গারি বিক্রেতা ও এলাহি মিয়া পেশায় শ্রমিক।

তারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত।

গ্রেপ্তারকৃত পাঁচজনই চার খুনের সঙ্গে জড়িত।

তবে গত সোমবার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কাজিমের ছেলে পারভেজকে গ্রেপ্তার করে জানায়, পারভেজ একাই হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

গ্রেপ্তারের পর মোবাইল ফোন চুরির জন্য গিয়ে দেখে ফেলায় পারভেজ একাই হত্যাকাণ্ড ঘটায় বলে বর্ণনাও দেয়।

গতকাল ভিডিও কনফারেন্সে র‌্যাব দাবি করে, পারভেজের বাবা কাজিম উদ্দিনসহ গ্রেপ্তারকৃত পাঁচজন জুয়াড়ি।

তারা নিহতদের বাড়ির কাছে নিয়মিত জুয়া, মাদক সেবনের আড্ডা দিত।

এ ছাড়া ভিকটিমদের তারা নানাভাবে হয়রানি করত।

গ্রেপ্তারকৃত কাজিমের ছেলে পারভেজ আনুমানিক দেড় মাস আগে সন্ধ্যার দিকে গোপনে ভিকটিমের বাড়ির খাটের নিচে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় গৃহকর্ত্রীর হাতে ধরা পড়েছিল।

কিন্তু এ দফায় টাকা লুটের জন্য সবাই মিলিত হয়ে ওই বাড়িতে ঢোকে এবং হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

শুধু খুনই নয়, পারভেজসহ কয়েকজন পালাক্রমে ধর্ষণ করেছে বলেও দাবি করেছে র‌্যাব।

এদিকে গতকাল র‌্যাব পাঁচজনকে গাজীপুরের পিবিআইয়ের তদন্তকারীদের কাছে হস্তান্তর করলে তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়।

গাজীপুরের আদালতে পিবিআই তদন্ত কর্মকর্তা আসামিদের ১০ দিন করে রিমান্ড আবেদন করেন।

আদালত প্রত্যেকের পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালতের পরিদর্শক মীর রকিবুল হক এ তথ্য জানান।

এদিকে গাজীপুর পোড়াবাড়ী ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার আব্দুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে জানান, গতকাল দুপুর পৌনে ২টার দিকে গাজীপুর জেলা পিবিআইয়ের কাছে পাঁচ আসামিকে হস্তান্তর করেছেন তাঁরা।

গতকাল ভিডিও প্রেস কনফারেন্সে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা কয়েক দিন আগে জানতে পারে, কাজল (গৃহকর্তা) মালয়েশিয়া থেকে হুন্ডির মাধ্যমে প্রায় ২০-২২ লাখ টাকা পাঠিয়েছেন।

ঘটনার পাঁচ-সাত দিন আগে কাজিম ও হানিফ ওই বাড়িতে ডাকাতির পরিকল্পনা করে।

অন্য আসামি বশির, হেলাল, এলাহি ও অন্যদের ডেকে নিয়ে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে।

এদের দলে কাজিমের ছেলে পারভেজও ছিল বলে জানায়।

আসামিরা আরো জানায়, তাদের আয়ের মাধ্যমে নেশা ও জুয়ার টাকার সংকুলান হচ্ছিল না বলে তারা এ অপরাধ সংঘটনে যুক্ত হয়।

আসামিদের উদ্ধৃতি দিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা গত ২৩ এপ্রিল ওই বাড়ির পেছনের এলাকায় জড়ো হয়।

প্রথমে পারভেজ ভেন্টিলেটর দিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।

হানিফ মাদারগাছ ও পাইপ বেয়ে ছাদে উঠে সিঁড়ির ঢাকনা খুলে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।

অন্যদের প্রবেশের জন্য বাড়ির পেছনের ছোট গেট খুলে দেওয়া হয়।

কাজিম, হেলাল, বশির, এলাহি এবং কয়েকজন পেছনের গেট দিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।

কাজিম ও হেলালসহ তিনজন প্রথমে ফাতেমার (গৃহকর্ত্রী) ঘরে ঢোকে এবং কাজিমের হাতে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে ফাতেমাকে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে বিদেশ থেকে পাঠানো টাকাগুলো দিতে বলে।

ফাতেমা এত টাকা নেই বলে জানান।

অতঃপর তিনি তাঁর কক্ষের স্টিলের শোকেসের ওপর রাখা টেলিভিশনের নিচে চাপা দেওয়া টাকা (৩০ হাজার) বের করে দেন।

পরে তারা ফাতেমার স্বর্ণালংকারগুলো ছিনিয়ে নেয় এবং পালাক্রমে ধর্ষণ করে। অন্যান্য কক্ষেও লুটতরাজ চলতে থাকে।

আসামি বশির, হানিফ ও এলাহিসহ আরো একজন ভিকটিম নূরাকে তাদের হাতে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে গলার চেইন ও স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেয়।

তাকেও পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয়।

আসামি বশিরসহ আরো একজন ফাতেমার ছোট মেয়ে হাওয়ারিনকে পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করে।

আসামি পারভেজও বর্ণিত হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণে অংশগ্রহণ করে।

আসামিরা আরো কয়েকজন সক্রিয় সহযোগীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য দিয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃতরা জানায়, ফাতেমা ও তাঁর মেয়েরা কয়েকজনকে চিনে ফেলায় তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়।

হত্যাকাণ্ডে আসামিরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও গলা কেটে ভিকটিমদের মৃত্যু নিশ্চিত করে।

তবে সর্বশেষে প্রতিবন্ধী শিশু ফাদিলকে হত্যা করা নিয়ে আসামিদের ভেতর দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সংশয় তৈরি হয়।

কিন্তু কোনো প্রকার সাক্ষী যেন না থাকে সে জন্য প্রতিবন্ধী শিশু ফাদিলকেও হত্যা করা হয়।

লুণ্ঠনকৃত মালপত্র ও টাকা কাজিম নিয়ে নেয় এবং সুবিধাজনক সময়ে নিজেদের মধ্যে বণ্টন করবে বলে বাকিদের জানায়।

গাজীপুর জেলা পিবিআইয়ের পরিদর্শক হাফিজুর রহমান জানান, আগে গ্রেপ্তার পারভেজ তার বয়স ১৭ বলে দাবি করেছিল।

বয়স বিবেচনায় তাকে আদালত টঙ্গীর কিশোর সংশোধনাগারে পাঠান। পারভেজের প্রকৃত বয়স নির্ধারণে পরীক্ষা করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ২৩ এপ্রিল গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার আবদার এলাকার একটি বাড়ির দ্বিতীয় তলায় স্মৃতি ফাতেমা (৩৮), তাঁর মেয়ে সাবরিনা সুলতানা নূরা (১৬), হাওয়ারিন (১৩) ও ছেলে ফাদিলের (৮) গলা কাটা লাশ উদ্ধার করা হয়।

২৪ এপ্রিল গৃহবধূর শ্বশুর আবুল হোসেন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে শ্রীপুর মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
Website Design and Developed By Engineer BD Network