৩১শে মে, ২০২০ ইং, রবিবার

 

ঈদে বাড়ি যাচ্ছেন : থাকুন হোম কোয়ারেন্টাইনে

আপডেট: মে ২২, ২০২০

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

শেষ হতে চলেছে সিয়াম সাধনার মাস রমজান। আর মাত্র দু’একদিন পরেই পবিত্র ঈদুল ফিতর। ধর্মপ্রাণ মুসলমান সারা মাস অপেক্ষা করেন এ উৎসবের জন্য। তাই তো উৎসব ও নাড়ীর টানে সবাই যার যার পরিবারের সাথে ঈদ পালন করতে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। কিন্তু এবারের ঈদ উৎসবের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস সংক্রমণের মাঝে এবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঈদুল ফিতর।

বাংলদেশসহ অন্যান্য দেশে এ ভাইরাস সংক্রমণের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সংক্রমণের শঙ্কা ও আতঙ্কের মাঝেই ঈদযাত্রায় নিজ নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটছেন। কিন্তু এ কারণে আবার সমগ্র দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। ঈদযাত্রা শেষে তাই বাসায় হোম কোয়ারেন্টাইনে অবস্থান করা জরুরি। কারণ অন্য বছরের তুলনায় এ বছর ঈদ উৎসবের সমসাময়িক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা।

হোম কোয়ারেন্টাইন কেন গুরুত্বপূর্ণ: এ পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ৫১ লাখের বেশি মানুষ করোনাভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়েছেন। ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। বাংলাদেশেও সংক্রমিত ও মৃত্যুবরণকারীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণে সাধারণত জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিলেও বর্তমানে অনেক কেস পাওয়া যাচ্ছে; যেখানে সংক্রমিত ব্যক্তির তেমন কোনো লক্ষণই প্রকাশ পাচ্ছে না। কিন্তু পরীক্ষা করলে টেস্ট পজিটিভ পাওয়া যাচ্ছে। ভাইরাস সংক্রমণের কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের এ পর্যায়ে তাই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

ঈদযাত্রাকালে অধিকাংশ ব্যক্তিকেই বিভিন্ন পরিবহনে একসাথে গাদাগাদি বা ঠেলাঠেলি ও ধাক্কাধাক্কি করে যাতায়াত করতে হয়। উপরন্তু ঈদযাত্রাকালে ঘনবসতিপূর্ণ আমাদের এ দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ভিড় পরিলক্ষিত হয়। এ জন্য যাত্রাকালে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা প্রায়ই সম্ভব নয়। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি কিন্তু থেকেই যায়।
উপসর্গবিহীন সংক্রমণের ঘটনাও এর সাথে যুক্ত হয়ে তা দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। কারণ আপনি হয়তো বুঝতে পারছেন না, কে ভাইরাস সংক্রমিত আর কে ভাইরাস সংক্রমিত নয়। এ জন্য নিজের ও পরিবারের সদস্যদের কথা চিন্তা করে হলেও এ বছর ঈদযাত্রা শেষে হোম কোয়ারেন্টাইনে অবস্থান করা উচিত। যেন আপনার থেকে পরিবারের প্রিয় সদস্যসহ অন্য ব্যক্তি সংক্রমিত না হয়।

কতদিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন: ঈদযাত্রা শেষে কারো বাড়িতে বা আশেপাশে কিংবা বাজারে অযথা ঘোরাঘুরি না করে নিজের ও আশেপাশের সবার কথা ভেবে হলেও কমপক্ষে ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকুন।

কী কী বিষয়ে খেয়াল রাখবেন: আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিধির (আইএইচআর-২০০৫) আর্টিকেল ৩২ অনুসারে ১৪ দিন স্বেচ্ছা বা হোম কোয়ারেন্টাইন পালন করার জন্য নিম্নলিখিত নির্দেশনাগুলো মেনে চলতে হবে—
* আলো-বাতাসের সুব্যবস্থা সম্পন্ন আলাদা ঘরে থাকুন এবং অন্য সদস্য থেকে আলাদাভাবে থাকুন। তা সম্ভব না হলে অন্যদের থেকে অন্তত ১ মিটার (৩ ফুট) দূরে থাকুন। ঘুমানোর জন্য পৃথক বিছানা ব্যবহার করুন। যদি সম্ভব হয়, তাহলে আলাদা গোসলখানা এবং টয়লেট ব্যবহার করুন। সম্ভব না হলে অন্যদের সাথে ব্যবহার করতে হয় এমন স্থানের সংখ্যা কমান। ওই স্থানগুলোতে জানালা খুলে রেখে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করুন।

* বুকের দুধ খাওয়ান এমন মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াবেন। শিশুর কাছে যাওয়ার সময় মাস্ক ব্যবহার করুন এবং ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।

* অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করুন। মাস্ক পরে থাকাকালীন এটি বারবার হাত দিয়ে ধরা থেকে বিরত থাকুন। মাস্ক ব্যবহারের সময় সর্দি, থুতু, কাশি, বমি ইত্যাদির সংস্পর্শে এলে সঙ্গে সঙ্গে মাস্ক খুলে ফেলুন এবং নতুন মাস্ক ব্যবহার করুন। মাস্ক ব্যবহারের পর ঢাকনাযুক্ত ময়লার পাত্রে ফেলুন এবং সাবান-পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।

* সাবান ও পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুয়ে ফেলবেন। সাবান না থাকলে প্রয়োজনে হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিংবা ৭০% আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহলবিশিষ্ট হ্যান্ড রাব ব্যবহার করা যেতে পারে।

* অপরিষ্কার হাতে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করবেন না।

* সাবান-পানি ব্যবহারের পর টিস্যু দিয়ে হাত শুকনো করে ফেলুন। টিস্যু না থাকলে শুধু হাত মোছার জন্য নির্দিষ্ট তোয়ালে বা গামছা ব্যবহার করুন এবং ভিজে গেলে বদলে ফেলুন।

* মুখ ঢেকে হাঁচি-কাশি দিন। হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলুন। হাঁচি-কাশির সময় টিস্যু পেপার বা মেডিকেল মাস্ক বা কাপড়ের মাস্ক বা বাহুর ভাঁজে মুখ ও নাক ঢেকে রাখুন এবং নিয়মানুযায়ী হাত পরিষ্কার করুন।

* টিস্যু পেপার ও মেডিকেল মাস্ক ব্যবহারের পর ঢাকনাযুক্ত বিনে ফেলুন।

* ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী অন্য কারো সাথে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করবেন না। আপনার খাওয়ার বাসনপত্র, তোয়ালে, বিছানার চাদর অন্য কারো সাথে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করবেন না। এসব জিনিসপত্র ব্যবহারের পর সাবান-পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে ফেলুন।

* আপনি কোয়ারেন্টাইনে থাকাকালীন পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবের সাথে ফোন, মোবাইল, ইন্টারনেটের সাহায্যে যোগাযোগ রাখতে পারেন। শিশুকে তার জন্য প্রযোজ্যভাবে বোঝান।

তাদের পর্যাপ্ত খেলার সামগ্রী দিন এবং খেলনাগুলো খেলার পরে জীবাণুমুক্ত করুন। আপনার দৈনন্দিন রুটিন, যেমন- খাওয়া, হালকা ব্যায়াম ইত্যাদি মেনে চলুন। বই পড়া, গান শোনা, সিনেমা দেখা অথবা উপর্যুক্ত নিয়মগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক নয়, এমন যেকোনো বিনোদনমূলক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করুন বা ব্যস্ত রাখুন।

* বর্তমানে সুস্থ আছেন এবং যার দীর্ঘমেয়াদী রোগসমূহ, যেমন- ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সার, অ্যাজমা ইত্যাদি নেই; এমন একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে পরিচর্যাকারী হিসেবে নিয়োজিত হতে পারেন।

কোয়ারেন্টাইনে আছেন এমন ব্যক্তির সাথে কোনো অতিথিকে দেখা করতে দেবেন না। কেয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে বা তার ঘরে ঢুকলে, খাবার তৈরির আগে ও পরে, খাওয়ার আগে, টয়লেট ব্যবহারের পরে, গ্লাভস পরার আগে ও খোলার পরে এবং যখনই হাত দেখে নোংরা মনে হয়- হাত ধুয়ে ফেলবেন।

* কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তির জন্য বিশেষ নির্দেশনা হলো- যদি কোয়ারেন্টাইনে থাকাকালীন কোনো উপর্সগ দেখা দেয় (১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি জ্বর, কাশি, সর্দি, গলাব্যথা, শাসকষ্ট ইত্যাদি)।

তবে অতি দ্রুত আইইডিসিআরের হটলাইন নম্বরে কিংবা স্বাস্থ্য বাতায়নের নম্বরে অথবা কাছের হাসপাতালের হটলাইন নম্বরে অবশ্যই যোগাযোগ করুন। পরবর্তী করণীয় জেনে নিন।

মনে রাখবেন, উপযুক্ত কোনো ব্যক্তির উপর কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তা অমান্য করা এবং তথ্য গোপন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তিনি সংক্রামক রোগ আইন ২০১৮ এর আওতায় কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
Website Design and Developed By Engineer BD Network