৮ই আগস্ট, ২০২০ ইং, শনিবার

 

জার্মান প্রবাসীর চোখে ‘বঙ্গবন্ধু

আপডেট: মে ৩১, ২০২০

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

 

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আমি বঙ্গঁবন্ধু কথা শুনলাম আজ বঙ্গঁবন্ধু আমার হৃদয় এক বিশ্ব নেতা । আমার বাড়ি মাদারীপুর জেলা বাহাদুরপুর ইউনিয়ান হবিগঞ্জ হাটের সংলগ্ন । হবিগঞ্জ হাটের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আড়িয়াল খাঁ নদী । ৭০দশকে নৌপথই আমাদের একমাত্র যাতায়াত ব্যবস্হা ছিলো ।
খুলনা টেকেরহাট হবিগঞ্জ হয়ে ঢাকা প্রতিদিন আড়িয়াল খাঁ নদী দিয়ে অনেক লঋ যাতায়াত করত ।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সকালবেলা এক অস্বাভাবিক ভাবে আমার ঘুম ভেঁঙ্গে যায় ।বাড়িতে দেখলাম কেমন জানি এক শোকের ছায়া তেমন কিছু বুজলাম না কারন আমি খুব ছোট্ট আমার বয়স তখন ৭/৮ বৎসর ।দেখলাম লঋ ঘাটে অনেক লোক জড়ো হয়ে বসে আছে । আমার বাবা চাচা দাদা গ্রামের অনেক মরুবি সেখানে উপস্হিত ।আমি আস্তেআস্তে দাদুর কোলে গিয়ে বসলাম দেখলাম অনেকের চোখে পানি সাদাপাকা দাড়িওলা দাদাদের চোখে পানি দেখে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল খুব মনোযোগ সহকারে বুজতে চেষ্টা করছিলাম কেন গ্রামের মানুষ একসাথে শোকে বাকরুদ্ধ ।এক মুরবি্ কাঁদতে কাঁদতে বলল ওরা শেখ সাহেবকে মেরে ফেললো ওরা কি করে পারলো শেখ মুজিবকে মারতে ? সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে রেডিও শুনছে। কিন্ত কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না বঙ্গঁবন্ধুকে মেরে ফেলা হয়েছে তাই সবাই অপেক্ষা করছে ঢাকা থেকে লঋ আসবে ঢাকায় কি ঘটেছে তা জনার জন্য । ঢাকা থেকে যথাসময় লঋ আসলো কিন্ত যাত্রীরা রেডিও সংবাদের বেশী তেমন কিছু বলতে পারলো না কিন্ত বেলাবারার সাথে সাথে সবাইকে বিশ্বাস করতে হল কিছু সেনা সদস্যরা বঙ্গঁবন্ধুকে হত্যা করছে । হয়তো বঙ্গবন্ধুর কথা আমি আগেও শুনিছি কিন্ত ১৫ই আগস্টের ঘটনা ছাড়া কোন সৃতি আমার মনে পরে না। আমার দুর্ভোগ্য বঙ্গঁবন্ধুর হত্যার খবরের মধ্য দিয়ে বঙ্গঁবন্ধুর সাথে আমার পরিচয় ।
এই সৃতি নিয়ে আমি বড় হতে লাগলাম যা জনলাম শুনলাম বুজলাম বঙ্গঁবন্ধুর জন্ম না হলে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হত না বাংলাদেশের আর এক নাম শেখ মুজিবুর রহমান । তিনি বিশ্বের একমাত্র নেতা যে নেতা জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এবং বঙ্গঁবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি অর্জন করে ছিল স্বাধীনতা ।
তিনি যে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিলেন সেই স্বাধীন বাংলাদেশেই তাকে স্বপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হল । হত্যা করে আইন পাশ করা হল এই হত্যার বিচার করা যাবে না বঙ্গঁবন্ধু বলা যাবে না জাতির পিতা লেখা যাবে না ৭ই মার্চের ভাষন শোনা যাবে না । ইতিহাসের পাতা ছুঁড়ে ফেলা হল লেখা হল নতুন ইতিহাস । দেখলাম রাস্ট্র কি ভাবে জাতির পিতাকে অস্বিকার করে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করতে লাগলো ।

১৯৮৫ সালের ৭ই অক্টোবর বিশেষ কারনে জীবনের প্রথমবার আকাশপথে এক অজানা উদ্দেশ্যে পশ্চিম জার্মান রওয়ানা হলাম । আপনজন ফেলে মনে মধ্য অনেক কষ্ট নিয়ে বিমানে উঠলাম । নিরব নিঃশব্দে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম নতুন স্বপ্ন নিয়ে । বার্লিন ইমিগ্রেশন পার হয়ে একটা টেক্সি নিয়ে গন্তব্য রওনা দিলাম । টেক্সি থেকে বার্লিন শহর দেখছিলাম কি সুন্দর শহর কত সুন্দর করে সাজানো । শহর দেখছিলাম আর ভাবছিলাম জীবনের প্রথম পরদেশে আসলাম নতুন দেশ নতুন ভাষা কি করে এই দেশে থাকবো । হঠ্যাৎ টেক্সি চালক কি জানি বলল আমি ইংরাজিতে বললাম আমি জার্মানিতে নতুন এসেছি আমি জার্মান জানি না তুমি কি ইংরেজি জান ? বলল হা আমাকে জিজ্ঞাসা করলো তুমি কোন দেশ থেকে এসেছো ? আমি বললাম বাংলাদেশ ও বলল বাংলাদেশ কোথায় ইন্ডিয়া ? আমি বললাম ইন্ডিয়া না ইন্ডিয়ার পাশের একটি স্বধীন দেশ বাংলাদেশ ।সে আমাকে বলল তোমাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ? বললাম হা আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । আমি তাকে বললাম তুমি তাকে চেন ? সে বলল আমি তাকে দেখি নাই আমি তার সম্বন্ধে জানি শেখ মুজিবুর রহমান একজন মহান নেতা তারমতো নেতা বারবার জন্মায় না ।জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য দুই একজন নেতার জন্ম হয় । কথা বলতে বলতে আমার গন্তব্য চলে এলাম টেক্সি চালককে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিলাম ।
৮০/৯০ দশকে জার্মানিতে বাংলাদেশ বললে অনেকই চিনতো না কিন্ত বঙ্গবন্ধুকে অনেক জার্মানরা চিনতো । একটা নেতার পরিচয় একটা দেশের পরিচয় বিদেশে না আসলে হয়তো জানা হতো না দেখা হত না বঙ্গবন্ধুকে বিদেশিরা কত ভালবাসে ।

২০২০ সালে আমরা পালন করছি জাতির জনক বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী ।জার্মানির বিভিন্ন শহরে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী ব্যপকভাবে পালন করার উদ্দ্যোগ নেওয়া হয়েছিল (করোনা ভাইরাসের কারনে আপাতত স্হগিত আছে ) ।বার্লিনে যে সমস্ত জার্মান রা বিশেষ করে রাজনিতিবিদ আইনজীবি বিশিষ্ট ব্যক্তি বর্গ যারা ১৯৮৮সালে বাংলাদেশে বন্যার কারনে বার্লিনে বসবাসরত প্রায় সকল বাংলাদেশীকে জার্মানিতে থাকার অনুমতি দিয়েছিলো , বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার দাবিতে সোচ্ছার ছিলো , ১/১১ সময় জননেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তির অন্দোলনে আমাদের সমর্থন করেছে তাদের কয়েকজনকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী প্রগ্রামে বিশেষ অতিথির আমন্ত্রণ জানানোর জন্য যোগাযোগ করে দেখা করে আমন্ত্রণ জানালাম ।১৯৮৬ সালে একজন আইনজীবির সাথে আমার পরিচয় হয়ে হয়েছিল তার মুখে জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু শুনে অবাক হয়েছিলাম তার প্রতি সম্মান শ্রদ্ধা অনেক গুন বেড়ে গিয়েছিল । ১/১১ সময় জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রলায়ের সামনে একটা ডেমোনেসটেশন দিয়াছিলাম পারমিশনের খুব অসুবিধা হচ্ছিল এই আইনজীবির সহযোগিতায় পারমিশন পেয়েছিলাম এবং ডেমোনেসটেশন করেছিলাম । অনেক কষ্ট করে তার সাথে দেখা করলাম ১৯৮৬ সাল থেকে বাংলাদেশীদের সাহায্য করার জন্য কৃতজ্ঞতা জানালাম এবং বললাম বার্লিনে বসবাসরত বাংলাদেশীদের সন্তান যারা এখানে জন্মগ্রহণ করেছে এই নতুন প্রজন্মের কাছে ও জার্মান বন্ধুদের কাছে বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরার জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী বার্লিনে ব্যপকভাবে পালন করতে যাচ্ছি আপনি উপস্হিত থেকে বঙ্গবন্ধুর উপর কিছু বললে আমরা আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো । তিনি খুব খুশি হলেন বললেন বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশের নেতা না শেখ মুজিবুর রহমান একজন বিশ্বনেতা তাকে নিয়ে অনেক প্রচার হওয়া উচিত বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরা দরকার আমি সুস্হ থাকলে অবশ্য বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী প্রগ্রামে উপস্হিত থাকবো । আজ দাদুর কথা খুব মনে পড়ল দাদু বেঁচে থাকলে দাদুকে বলতাম শেখ সাহেব শুধু বাংলাদেশের নেতা নন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বিশ্বনেতার নাম ।

লেখক জার্মানি থেকে
মিজানুর হক খান
সাবেক সভাপতি বার্লিন আওয়ামী লীগ

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
Website Design and Developed By Engineer BD Network