২১শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার

স্কুলটি তলিয়ে গেল : কিছুই করতে পারলাম না

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

রাজশাহীর বাঘায় পদ্মার ভাঙনের কবলে পড়ে এবার ৩৭ বছর আগের প্রতিষ্ঠিত লক্ষ্মীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বিলীন হয়ে গেল। বৃহস্পতিবার স্কুলটি নিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মজিবর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, ‘চোখের সামনে বিদ্যালয়টি পদ্মায় তলিয়ে গেল। শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, কিছুই করতে পারলাম না। নিলাম ডাকে বিক্রি করা ভবনটি ভেঙে নিচ্ছেন ক্রেতা। আর প্রায় ১৬ গজ ভাঙলেই নদীগর্ভে চলে যাবে বিদ্যালয়টির জমিও।’

জানা যায়, বিদ্যালয়টি ১৯৮৭ সালে ৩৩ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়টি ১৯৯৮ সালে ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একতলা এবং ২০১১ সালে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে দোতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়ানো বিদ্যালয়টি অবশেষে পদ্মার ভাঙন থেকে রক্ষা পেল না।

কোনো উপায় না পেয়ে বিদ্যালয়টির নির্মাণসামগ্রী ২ লাখ ৩৯ হাজার ৯৯৮ টাকায় বিক্রি করে দেয়া হয়। ঠিকানা হারানো বিদ্যালয়টি এখন কোথায় নিয়ে যাবে, সেই চিন্তায় পড়েছে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটি।

শুধু ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, গত ৮ বছরে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে ৫টি বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে চরাঞ্চলের মানুষের ছিল অনেক মধুর স্মৃতি। পদ্মা নদীর কারণে বিচ্ছিন্ন বাঘা উপজেলার অবিভক্ত চকরাজাপুর ইউনিয়ন। দুর্গম ওই চরের চারদিকে পদ্মা নদী।

চকরাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা জানান, ১৯৩৫ সাল থেকে দুর্গম পদ্মা চরের মধ্যে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে, ৯টি প্রাথমিক ও দুটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

এর মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে চৌমাদিয়া, আতারপাড়া, চকরাজাপুর, পলাশী ফতেপুর, লক্ষ্মীনগর, চকরাজাপুর, পশ্চিম চরকালীদাসখালী, পূর্বচকরাজাপুর। উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে চকরাজাপুর ও পলাশী ফতেপুর।

১৯৩৫ সালে প্রথম প্রতিষ্ঠিত পলাশী ফতেপুর ও দ্বিতীয়টি ১৯৫৫ সালে চৌমাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৭৩ সালের পরবর্তী সময়ে চকরাজাপুরসহ অন্যান্য প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১৯৭৮ সালে চকরাজাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও পরে পলাশী ফতেপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।

২০০৫ সালে ভাঙনের কবলে পড়ে চৌমাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পরবর্তী সময়ে ভাঙনের কবলে পড়ে ঠিকানা হারায় পলাশী ফতেপুর, আতারপাড়া, চকরাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়। তবে এ বছর চরকালীদাসখালী, লক্ষ্মীনগর প্রাথমিক বিদ্যালয় ঠিকানা হারাল।

চকরাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুস সাত্তার জানান, প্রথমে ১৯৯৮ সালে ভাঙনের কবলে পড়ে বিদ্যালয় ও চকরাজাপুর বাজার। সে বছর সরিয়ে নেয়ার পর ২০১২ সালে ভাঙনের কবলে পড়ে ওই বিদ্যালয় ও বাজার। পরে পুনরায় কালীদাসখালী মৌজায় সরিয়ে নেয়ার পর ২০১৮ সালে আবারও ভাঙনের কবলে পড়ে বিদ্যালয়ের পাকা ভবন ও বাজার।

২০০০ সালে উপজেলার মনিগ্রাম ইউনিয়নের মীরগঞ্জ, পাকুড়িয়া ইউনিয়নের আলাইপুর গোকুলপুর, কিশোরপুর পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার এলাকায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। তার পর থেকেই প্রতি বছর ভাঙতে থাকে পদ্মা।

২০০৪ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙনকবলিত জায়গাগুলোতে বালির বস্তা দিয়ে তা ঠেকানোর পর ২০০৫ সালে উদয়নগর বর্ডার গার্ড (বিজিবি) ক্যাম্পসহ চৌমাদিয়া গ্রামটি রক্ষার জন্য ব্লক বসায় পানি উন্নয়ন বোর্ড। সে ব্লক বসানোর কয়েক দিন পর সেগুলো নদীতে ভেসে যায়।

এ বিষয়ে চকরাজাপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আজিজুল আযম জানান, গত তিন দশকে ভাঙনের কবলে পড়ে নদীতে বিলীন হয়ে যায় হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি, বসত ভিটা, রাস্তাঘাট, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ কবরস্থান।

পাকুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মেরাজুল ইসলাম মেরাজ জানান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপির সার্বিক সহযোগিতায় ৭২২ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১২.১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়েছে।

বর্ষা মৌসুম শেষে বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হবে। এ কাজ শুরু হলে ভাঙন থেকে রক্ষা পাবে পদ্মা পাড়ের মানুষ। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকায় গত বছর থেকে কিছু স্থানে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে রক্ষা করা হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শুরু হলে এর সমাধান আসবে।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
   
Website Design and Developed By Engineer BD Network