২৪শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার

 

আজ বিশ্ব এনেসথেসিয়া দিবস

আপডেট: অক্টোবর ১৬, ২০২০

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
  • ডাঃ মোঃ নাজমুল আহসান ও ডাঃ এ.কে.এম ফখরুল আলম

অপারেশনের কথা শুনলে কার মনে না ভীতির সঞ্চার হয়? সবাই মনে মনে ভাবে একজন দয়া-মায়াহীন কসাই ডাক্তার হাতে একটা বড় ছুরি নিয়ে কাটাকাটির উদ্দেশ্যে ওটির মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেক রোগী ভয় পেয়ে বলেই ফেলে- স্যার, আমাকে অজ্ঞান করে নেন। আমি যেন ব্যথা না পাই। সার্জন তখন বলেন- এই যে অজ্ঞানের স্যার আছেন। তিনিই আপনাকে অজ্ঞান করবেন। আপনি কোন ব্যথা পাবেন না। এরপরে অজ্ঞানের ডাক্তার হয়ত তাকে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে অজ্ঞান করেন এবং সম্পূর্ণ ব্যথামুক্তভাবে অপারেশন সম্পন্ন্ হয় এবং রোগী হাসতে হাসতে বাড়ী চলে যায়। বর্তমানে অপারেশনকালীন রোগী মৃত্যুহার একেবারেই নগন্য।
বর্তমানে অপারেশন থিয়েটারের ভিতরের দৃশ্য হয়ত অনেকেই নিজ চোখে দেখেছেন বা আত্মীয়-স্বজনের মুখে শ্রবণ করেছেন। প্রায় সব রোগী এবং তার আত্মীয়-স্বজন একটু ভয় পায় ঠিকই তবে জানে, অপারেশনকালীন সময়ে রোগী কোন ব্যথা পাবে না এবং রোগীর কোন সমস্যা হবে না। রোগীর মাথার কাছে একজন অজ্ঞানের ডাক্তার থাকেন যিনি অপারেশনকালীন সময়ে রোগীর যাবতীয় বিষয় লক্ষ্য রাখেন। তিনি অপারেশনের পূর্বে রোগীর সমস্যার ব্যাপারে কথা বলেন, অপারেশনের ধরন অনুযায়ী রোগীকে পুরোপুরি অজ্ঞান করেন অথবা রোগীর কোমর থেকে নিচের অংশে অবস করেন অথবা কোন একটি হাত অবস করে দেন। এরপর সার্জন নিশ্চিন্তে অপারেশন সম্পন্ন করেন। অপারেশন শেষে আবার রোগীর জ্ঞান ফিরিয়ে পোস্ট-অপারেটিভ রুমে রোগীকে রেখে পরবর্তীতে ব্যথা নিরাময়ের চিকিৎসা দিয়ে তিনি তার দায়িত্বভার সম্পন্ন করেন।এখনকার পরিবেশে রোগী, সার্জন এবং এনেসথেটিস্ট সবাই নির্ভয়ে শঙ্কামুক্তভাবে অপারেশন থিয়েটারে কাজ করেন। কিন্তু আমরা যদি মাত্র দুইশত বছর পিছনে ফিরে তাকাই তাহলে দেখতে পাব পরিস্থিতি এত সহজ ছিল না, তখন ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করত। দশজনে মিলে রোগীকে সজোরে চেপে ধরে সার্জন অপারেশন করতেন এবং বেশিরভাগ রোগীই মারা পড়ত। অপারেশন থিয়েটারে তখন রোগী, সার্জন এবং অন্যান্যরা সবাই থাকত তটস্থ। এই যে বিশাল পরিবর্তন – এর পিছনে একমাত্র কারণ এনেসথেসিয়ার উন্নয়ন।
এনেসথেসিয়ার উন্ন্য়নের পথ এত মসৃন ছিল না। হাজার হাজার বছরের পথচলায় আজকের এই প্রাপ্তি। এনেসথেসিয়ার উন্নয়নকালকে আমরা চারটি ভাগে ভাগ করতে পারি –
ক) প্রাগৈতিহাসিক যুগ/ রহস্যময় যুগ ( ১৮৪৬ সালের পূর্ব যুগ)
খ) ঐতিহাসিক যুগ/ প্রতিষ্ঠা যুগ ( ১৮৪৬ সাল থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত)
গ) আধুনিক যুগ/ উন্নয়নের যুগ ( ১৯০১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত)
ঘ) ভবিষ্যত কাল/ ডিজিটাল যুগ(২০০০ পরবর্তী যুগ)
১. প্রাগৈতিহাসিক যুগ/ রহস্যময় যুগ ( ১৮৪৬ সালের পূর্ব যুগ) ঃ ১৮৪৬ সালের পূর্বে মানুষের কাছে ব্যথা ছিল বিধাতার এক রহস্যময় সৃষ্টি। তখনও যে অপারেশন হতো না – তা নয়, তবে সেগুলো ছিল ছোট-খাট বা জরুরী অপারেশন, যেমন- ফোঁড়া কাটা, দাঁত তোলা, পঁচা পা কেটে ফেলা। আর অজ্ঞানের পদ্ধতি হিসাবে যেগুলো ব্যবহ্্রত হতো সেগুলোও ছিল ভয়ঙ্কর। যেমন – গলা চেপে ধরে অজ্ঞান করা, মাথায় লাঠি দ্বারা আঘাত করে অজ্ঞান করা, অত্যাধিক অ্যালকোহল খাইয়ে মাতাল করে দেওয়া এবং সবচেয়ে বহুল প্রচলিত পদ্ধতি – দশজনে মিলে চেপে ধরে অপারেশন করা। বলাই বাহুল্য যে, এতে বেশীর ভাগ রোগীই অকালে মারা যেত।
২. ঐতিহাসিক যুগ ( ১৮৪৬ সাল থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত) ঃ তৎকালীন সময়ে নাইট্রাস গ্যাস বা লাফিং গ্যাস পার্টি খুবই জনপ্রিয় ছিল। একটি পলিথিনের মতো ব্যাগে নাইট্রাস গ্যাস ভরে সেটা থেকে মুখ দিয়ে শ্বাসের সাথে টেনে নিত। এতে একটা ভাল লাগার অনুভূতি আসত। এরপরে নাচ-গানের আসর বসত। ১৮৪৪ সালে এরকম একটা পার্টিতে হোরাস ওয়েলস নামে একজন ডেন্টিস্ট লক্ষ্য করেন, একজন মহিলা নাচতে গিয়ে খুব বিশ্রীভাবে একটা বেঞ্চের উপর পড়ে গেলেন কিন্তু যতটা আঘাত পাওয়ার কথা ছিল অতটা পেলেন না। তখন তিনি ভাবলেন, নিশ্চয় নাইট্রাস অক্সাইডে এমন কিছু আছে যা ব্যথা কমায়। এরপর তিনি তার চেম্বারে রোগীর দাঁত তোলার সময় নাইট্রাস অক্সাইড ব্যবহার করলেন এবং ব্যথা ছাড়াই দাঁত তুলতে সক্ষম হলেন। সফল এই পরীক্ষার পর তিনি ঘোষণা দিলেন – তিনি ব্যথাকে জয় করেছেন। ব্যথা ছাড়াই অপারেশন করা সম্ভব। এর বাস্তব রূপ দিতে ১৮৪৫ সালে বোস্টনের ম্যাচাচুয়েটস জেনারের হাসপাতালে অপারেশনের আয়োজন করা হল। হোরাস ওয়েলস রোগীকে নাইট্রাস ইনহেলেশন করালেও সার্জন যখন অপারেশন শুরু করলেন, রোগী ব্যথায় চিৎকার করে উঠল। আসলে নাইট্রাস অক্সাইড ব্যথা কমাতে সক্ষম হলেও অজ্ঞানের জন্য যথেষ্ঠ নয়। ফলে হোরাস ওয়েলস পর্যুদস্থ ও অপমানিত হলেন এবং পরবর্তীতে আত্মহত্যা করেন। পরবর্তী সালে উইলিয়াম থমাস গ্রীন মর্টন ইথার ব্যবহার করে অজ্ঞান করে তার চেম্বারে ব্যথামুক্তভাবে দাঁত তুলতে সক্ষম হন। এবারেও স্বীকৃতির জন্য ১৮৪৬ সালের ১৬ই অক্টোবর বোস্টনের ম্যাচাচুয়েটস জেনারের হাসপাতালে অপারেশনের আয়োজন করা হল এবং সার্জন ডাঃ জন কলিন ওয়ারেন রোগী গিলবার্ট এবোট-এর থুতনীর নিচের টিউমার কোন ব্যথা ছাড়াই সফলভাবে অপসারনে সক্ষম হলেন। অপারেশন শেষে সার্জন অন্যান্য ডাক্তারদের উদ্দেশ্যে বললেন, “ভদ্রমহোদয়গণ, এটা কোন দম্ভোক্তি নয়।” তাই ১৮৪৬ সালের ১৬ই অক্টোবর এনেসথেসিয়া বিভাগের জন্য এক স্বর্নালী দিন এবং এ দিনটিকে “বিশ্ব এনেসথেসিয়া দিবস” হিসাবে সারাবিশ্বে পালন করা হয়। এবছরও এ দিনটি ১৭৪তম “বিশ্ব এনেসথেসিয়া দিবস” হিসাবে পালিত হচ্ছে এবং এবারে এ দিনটির প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে – “ এনেসথেটিস্টদের পেশাগত নিরাপত্তা (করোনাকালীন মহামহামারিতে ভূমিকা ও পেশাগত ঝুঁকি) ”এরপরে এনসথেসিয়ার প্রসার ঘটতে থাকে দ্রæত।
৩. আধুনিক যুগ/ উন্নয়নের যুগ ( ১৯০১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত) ঃ ১৯০০ সালের পর থেকে নতুন নতুন ওষুধ ও বিভিন্ন মনিটরিং সিস্টেম আবিষ্কারের ফলে এনেসথেসিয়া বিভাগের প্রভূত উন্নয়ন ঘটে। ফলে এসময় বিভিন্ন ধরনের জটিল অপারেশন যেমন – কার্ডিও- থোরাসিক বাইপাস সার্জারি, নিউরোসার্জারি, প্লাস্টিক সার্জারি করা সম্ভবপর হয় এবং রোগী মৃত্যুর হারও একেবারে নগন্যে চলে আসে। সাথে সাথে এনেসথেসিয়া বিভাগের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার বিস্তার লাভ ঘটে। যেমন-
এনালজেসিয়া বা পেইন ক্লিনিকঃ সব ধরনের ব্যথা নিরাময়ের চিকিৎসার পাশাপাশি ব্যথামুক্ত নরমাল ডেলিভারি করা হয়।
আই.সি.ইউঃ মুমূর্ষূ রোগীকে বাঁচানোর জন্য চিকিৎসা ও ধৈর্য্যের শেষ বিন্দু দিয়ে বিধাতার সাথে যুদ্ধ করা হয়।
পেলিয়েটিভ কেয়ারঃ যে সকল রোগের চিকিৎসা সম্ভব নয়, যেমন – ক্যান্সার, তাদের উপসর্গ উপশমে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
৪. ভবিষ্যত কাল/ ডিজিটাল যুগ (২০০০ পরবর্তী যুগ) ঃ ভবিষ্যতেও নতুন নতুন ওষুধ ও আরও নতুন নতুন যন্ত্রপাতি ও মটিরিং সিস্টেম আবিষ্কারের ফলে এনেসথেসিয়া বিভাগও ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করবে। আমরা তখন স্মার্টফোন এনেসথেসিয়া, টেলি এনেসথেসিয়া , রোবোটিক এনেসথেসিয়া, ন্যানো এনেসথেসিয়া, জেনোম এনেসথেসিয়া, অটো এনেসথেসিয়া,অটো টিভার যুগে প্রবেশ করবে।
এনেসথেসিয়ার যতই উন্নয়ন ঘটবে ততই জটিল অপারেশন করা সম্ভবপর হবে এবং রোগী মৃত্যুহারও কমবে এবং মানুষের অপারেশন ভীতিও কমবে। এবারের করোনাকালীন সময়ে এনেসথেটিস্টরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেছেন । তাদেরকে আই.সি.ইউ তে মুমূর্ষূ রোগীদের সামলাতে হয়েছে এবং ওটিতেও জেনারেল এনেসথেসিয়া দেওয়ার সময়ে শ্বাসনালীতে নল দেওয়ার মতো সবচেয়ে ঝুঁকির কাজ করতে হয়েছে এবং এ মহামারিতে এনেসথেটিস্টরাই সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত হয়েছেন ও মারা গিয়েছেন। নিশ্চয়এনেসথেটিস্টদের এই ত্যাগ জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।

লেখকদ্বয় : সহকারী অধ্যাপক, এনেসথেসিয়া,পেইন ও আই.সি.ইউ বিভাগ, শে.বা.চি.ম, বরিশাল।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
Website Design and Developed By Engineer BD Network