২৫শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার

 

বড়দিনের তাৎপর্য -ফাদার অনল টেরেন্স ডি’কস্তা, সিএসসি

আপডেট: ডিসেম্বর ২৪, ২০২০

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

ভূমিকা: প্রতি বছর বড়দিন এলেই সাপ্তাহিক প্রতিবেশীর বড়দিন সংখ্যা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংঘ-সমিতি তাদের নিয়মিত প্রকাশনায় লেখা আহ্বান করেন। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ ক’রেও লেখা চান। এবারও তার ব্যর্তয় ঘটেনি। কি লিখবো, কি লিখবো চিন্তা করতে করতে মনে করলাম বাইবেলীয় ও ঐতিহ্যগত তথ্যের ভিত্তিতে বড়দিনের কয়েকটি খুুটিনাটি বিষয় নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখি। কয়েকটি শব্দ বা বিষয়কে কেন্দ্র করে আমার এবারের বড়দিনের প্রয়াস।

বড়দিন: আজ ২৫শে ডিসেম্বর, আজ বড়দিন। “বাণী একদিন হলেন রক্তমাংসের মানুষ; বাস করতে লাগলেন আমাদেরই মাঝখানে। আর আমরা তাঁর মহিমা প্রত্যক্ষ করলাম, একমাত্র পুত্র হিসাবে পিতার কাছ থেকে পাওয়া সেই যে মহিমা-ঐশ অনুগ্রহ ও সত্যের সেই যে পূর্ণতা” (যোহন ১:১৪)। প্রবক্তার মুখে উচ্চারিত প্রভুর বাণী “শোন, কুমারী কন্যাটি হবে গর্ভবতী; সে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেবে। একদিন সবাই তাকে ইম্মানুয়েল নামে ডাকবে” (মথি ১:২৩) সত্য হয়েছে। স্বর্গ রাজের তনয় আমাদের প্রেমের রাজা ও মুক্তিদাতা প্রভু যীশু খ্রীষ্ট আজ জন্ম গ্রহণ করেছেন। তাই আজ আনন্দের দিন, মিলনের দিন, একতার দিন, উৎসবের দিন; আজ শুভ বড়দিন।

গোশালা: রোম সম্রাট অগাস্টাসের হুকুম জারি হল, সমস্ত সাম্রাজ্যে লোকগণনা করা হবে। তাই নাম লেখাবার জন্য যোসেফ ও সন্তান-সম্ভবা মারীয়া গালিলেয়ার নাজারেথ শহর থেকে তাদের নিজ এলাকা যুদেয়ার দাউদ-নগরী বেথলেহেমে গেলেন। এত মানুষের ভীরে সেখানকার পাস্থশালা গুলোতে তাদের থাকার জায়গা হলো না। তাই তারা আশ্রয় নিলেন একটি গোয়াল ঘরে। সেখানেই মারীয়া প্রসব করলেন শিশু যীশুকে (লুক ২:১-৭)। ঈশ্বর দীনবেশে গোয়াল ঘরে জন্ম নিয়ে পৃথিবীর দীনতাকে বরণ করে নিলেন।

রাখাল: এই মহান রাজাধিরাজের জন্ম সংবাদ প্রথমে কোন রোমীয় শাসক বা সম্রাট, ইস্রায়েলের সামন্তরাজ বা রাজা কিংবা কোন রাষ্ট্রীয় ব্যক্তি বা মন্ত্রী পাননি। কোন ধনী মানুষ, প্রভাবশালী ব্যক্তি, ধর্মীয় গুরু বা রাজনৈতিক নেতা পাননি। মহান রাজার জন্ম সংবাদ সর্বপ্রথমে রাখালেরা পেয়েছেন। সেই রাতে একদল রাখাল তাদের পশুগুলিকে পাহারা দিচ্ছিল, এমন সময় প্রভুর এক দূত তাদের কাছে এসে বললেন, “ভয় পেয়ো না! আমি এক মহা আনন্দের সংবাদ তোমাদের জানাতে এসেছি; এই আনন্দ জাতির সমস্ত মানুষের জন্যেই সঞ্চিত হয়ে আছে। আজ দাউদ-নগরীতে তোমাদের ত্রাণকর্তা জন্মেছেন-তিনি সেই খ্রীষ্ট, স্বয়ং প্রভু। এই চিহ্নে তোমরা তাঁকে চিনতে পারবে: দেখতে পাবে কাপড়ে জড়ানো, জাবপাত্রে শোয়ানো এক শিশুকে” (লুক ২:৮-১২)। রাখালেরা ছুটে গেল বেথলেহেমে, তাদেরকে যেমনটি বলা হয়েছিল, সব-কিছু ঠিক সেই ভাবেই দেখতে পেলেন (লুক ২:২০খ)। গোশালায় দীনবেশে জন্ম নিয়ে তিনি রাখালদের মত সাধারণ, অসহায়, দূর্বল, ছোট ও গরীবের বন্ধু হয়েছেন। আমাদের সাথে তিনি একাত্বতা প্রকাশ করেছেন।

পণ্ডিত: সাধারণ বেশে জন্ম নিলেও তিনি সাধারণ নন। এই মহান রাজার জন্মের শুভ সংবাদ পেয়ে সুদূর পাচ্য দেশের জ্যোতির্বিদ পণ্ডিতগণ আকাশের তারা দেখে নব-রাজাকে খুঁজতে খুঁজতে যুদেয়ার বেথলেহেম নগরে যান। যুদেয়ার রাজা হেরোদকে তারা জিজ্ঞেস করেন, “ইহুদীদের যে-রাজা জন্মেছেন, তিনি কোথায়? কারণ আমরা তাঁরই তারাটি উদিত হতে দেখেছি এবং আমরা এসেছি তাঁর চরণে প্রণাম জানাতে” (মথি ২:২)। তাঁরা শূণ্য বা খালি হাতে নয়। তাঁরা সাথে করে “সোনা, ধূপধুনো ও গন্ধনির্যাস” (মথি ২:১১খ) উপহার হিসেবে নিয়ে যান। এই উপহার সাধারণ নয়, এমনকি সাধারণ ব্যক্তিদের দেওয়া হয় না। এই উপহার একমাত্র সম্মানী ব্যক্তি, রাজা ও ঈশ্বরকেই দেওয়া হয়। “শিশুটিকে মারীয়ার কোলে দেখতে পেয়ে তাঁরা ভূমিষ্ঠ হয়ে তাঁকে প্রণাম করলেন (মথি ২:১১ক)।

তারা: হতাশার মাঝে আশা, অজ্ঞানতার মাঝে জ্ঞান, অসত্যের মাঝে সত্য ও অন্ধকারের মাঝে আলো জ্বালাতে যীশু খ্রীষ্টের জন্ম। তার আগমনে অন্ধকার দূরীভূত হয়ে জগতে এসেছে আলো। “তিনি সেই সত্যকার আলো, যে-আলো প্রতিটি মানুষের অন্তর উদ্ভাসিত করে” (যোহন ১:৯)। আকাশে উদিত তারাটি পণ্ডিতদের পথ দেখিয়ে “তাঁদের আগে আগে চলতে লাগল, যতক্ষণ না সেই স্থানটির ওপর এসে থামল, যেখানে শিশুটি ছিলেন। তারাটিকে দেখতে পেয়ে তাঁরা আনন্দে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলেন” (মথি ২:৯-১০)।

স্বর্গ দূত: পৃথিবীতে খ্রীষ্ট রাজার জন্মে স্বর্গের দূতেরাও আনন্দিত। তাই আনন্দে স্বর্গের দূতবাহিনী পরমেশ্বরের বন্দনা ক’রে বলে উঠলেন: “জয় ঊর্ধ্বলোকে পরমেশ্বরের জয়! ইহলোকে নামুক শান্তি তাঁর অনুগৃহীত মানবের অন্তরে” (লুক ২:১৩-১৪)। যীশু খ্রীষ্টের আগমনে স্বর্গ-মত্য আর পাতাল আজ আনন্দে মুখরিত।

সান্তাক্লস: লম্বা-সাদা দাঁড়ি ও লাল টুপি-কোট পড়া সান্তাক্লস আসলে সেন্ট নিকোলাস, যিনি বর্তমান তুরস্কের পাতারা এলাকার একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তি ও যাজক ছিলেন। তিনি ছিলেন শিশুদের রক্ষাকারী। তিনি শিশুদের ভালবাসতেন ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের যত্ন নিতেন। তিনি বাল্য বিবাহ, শিশু ও নারী পাচার এবং যৌতুক প্রথা বন্ধে অনেক দৃষ্টান্তমূলক কাজ করেছেন। তিনি শিশুদের নানারকমের খেলনা ও চকোলেট উপহার দিতেন। তাকে ক্রিশমাস ফাদারও বলা হয়। বড়দিনের সময় শিশুরা অপেক্ষায় থাকতেন ক্রিশমাস ফাদারের কাছ থেকে উপহার সামগ্রী পাওয়ার জন্য। উপহার প্রদান বড়দিনের আনন্দেরই একটি অংশ। কারণ ঈশ্বর তার পুত্রকে জগতের জন্য উপহার হিসেবে দিয়েছেন। তাই সান্তাক্লস সবাইকে উপহার দিয়ে বড়দিনের আনন্দকে বাড়িয়ে তোলেন।

ক্রিশমাস ট্রি: বড়দিনে প্রতিটি গির্জায় এমনকি প্রতিটি বাড়ীতে ক্রিশমাস ট্রি সাজানো একটি রীতিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বড় বড় শপিং মল গুলোতেও বড়দিনের অনেক আগেই ক্রিশমাস ট্রি সাজানো দেখা যায় এবং ক্রিশমাস মিউজিক শোনা যায়। চির সবুজ ক্রিশমাস ট্রিকে যীশু খ্রীষ্টের জন্মের বিভিন্ন ঘটনাবলীর প্রতীক দিয়ে নানানভাবে সজ্জ্বিত ও আলোকময় করা হয়। এর মধ্যদিয়ে যীশু খ্রীষ্টের আগমন বার্তা প্রকাশিত হয়, বড়দিনের আনন্দ উদ্যাপিত হয় এবং স্বর্গীয় জীবন বৃক্ষের প্রতীক হিসেবে খ্রীষ্টকে অন্তরে বরণ করে নেওয়া হয়।

উপসংহার: আজ বড়দিন, আনন্দের দিন, আজ যীশু খ্রীষ্টের জন্ম আমাদের আহ্বান করছে, যেন হতাশা থেকে আশা, অসত্য থেকে সত্যে, অন্ধকার থেকে আলোতে আর পাপের জরা-জীর্ণতা থেকে ক্ষমা, মিলন ও ভালোবাসার রাজ্যে আমরা সবাই পদার্পণ করতে পারি। শুভ বড়দিন।।

ফাদার অনল টেরেন্স ডি’কস্তা, সিএসসি
ডাইওসিসান সেক্রেটারী
বরিশাল কাথলিক ডাইওসিস
০৫, সদর রোড, বরিশাল
মোবাইল: ০১৭৪৬৪৩০২৯০

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
 
Website Design and Developed By Engineer BD Network