২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার

 

আলতাফ মাহমুদ স্মৃতি পদক পেলেন সৈয়দ দুলাল

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
  • সাঈদ পান্থ

বরিশালের ২৭ টি সংগঠনের জোট সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের আয়োজনে শহীদ আলতাফ মাহমুদ স্মৃতি পদক পলো বরিশাল তথা বাংলাদেশে একজন প্রথিতযশা নাট্যজন সৈয়দ দুলাল। নাট্যজন হিসেবে সমধিক পরিচিত ।তাঁর পিতা সৌখিন নাট্যশিল্পী হিসেবে সেই সময় ব্যাপক পরিচিত ছিলেন – পিতার অভিনয়ে আকৃষ্ট হয়েই শৈশব-কৈশােরে নাটকে তাঁর পদচারণা শুরু। বরিশালে আধুনিক নাট্যধারার প্রাণপুরুষ আকবর হােসেনের সংস্পর্শে এসে উত্তাল উনসত্তরে গড়ে ওঠা গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের প্রথম সংগঠন খেয়ালী গ্রুপ থিয়েটারে কাজ শুরু করেন। দর্শনীর বিনিময়ে বরিশালে | মঞ্চায়িত প্রথম নাটকের অভিনেতা ছিলেন তিনি। শব্দাবলীর প্রতিষ্ঠালগ্নে বন্ধু শাহনেওয়াজ ও প্রয়াত হুমায়ুন কবীর সেলিমের উৎসাহে তিনি শব্দাবলীতে যােগ দেন। অল্প। সময়ের মধ্যেই তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সকলের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হন। কিছুদিনের মধ্যে তিনি শব্দাবলীর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। কয়েকবছর কাজ করার পর রুটি-রুজির প্রয়ােজনে চলে যান সূদুরপ্রাচ্যে। প্রবাসে যাওয়ার আগে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান আয়ােজিত নির্দেশনা বিষয়ক কর্মশালা থেকেই স্টুডিও থিয়েটারের ধারণা লাভ করেন। অর্থ এবং প্রবাস জীবন তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি বেশি দিন। দেশে ফিরে এসে ১৯৯১ সালের ৩১শে ডিসেম্বর শব্দাবলীতে মেষ ও রাক্ষস নাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে। স্টুডিও থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন। গর্বের সাথে বলতে হয় – বরিশালের নাট্যজন সৈয়দ দুলালই বাংলাদেশে স্টুডিও থিয়েটারের প্রবর্তক। তিনি বরিশালে শিশুদের নিয়ে নাটকের কাজ করার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন শব্দাবলী’র শিশু থিয়েটার। তিনি দীর্ঘ সময় শব্দাবলীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সৈয়দ দুলাল ১৯৫৩ সালে ৩রা জুলাই জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা সৈয়দ আলতাফ হােসেন, মা উম্মে কুলসুম। পাঁচ ভাই। এবং এক বােনের পরিবারে তিনি বড় সন্তান। সহধর্মিনী রেহানা সৈয়দ রুনু। ছেলে সৈয়দ শুভ এবং মেয়ে ইপশিতা। নীতি-সহ পরিজন নিয়ে বরিশাল নগরীর বটতলা মীরা বাড়ি পৈতৃক ভিটায় তার সংসার।

সৈয়দ দুলালের শিক্ষাজীবন শুরু হয় নব আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৬৯ সালে ঐতিহ্যবাহী আসমত আলী খান(এ. কে)ইনস্টিটিউট থেকে তিনি এস.এস.সি, সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ থেকে ১৯৭২ সালে এইচ.এস.সি. এবং ১৯৭৬ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি একজন ব্যবসায়ী। সৈয়দ দুলাল বরিশালের ইতিহাস-ঐতিহ্য-শিল্প-সাহিত্যসংস্কৃতির পথরেখায় প্রায় তিন দশক ধরে মাসিক আনন্দ লিখন পত্রিকার সম্পাদনা করছেন। বরিশালের অন্যতম। আঞ্চলিক দৈনিক আজকের পরিবর্তন পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবে এক যুগ দায়িত্ব পালন করেন । সংস্কৃতি ও সংস্কৃতিকর্মী বান্ধব সৈয়দ দুলাল বিভিন্ন সময়ে দীর্ঘ ১০ বছর বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদে সভাপতি এবং ১ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন। করেন। ১৯৯৩ সালে বরিশালে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের তিনি প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক এবং সভাপতি হিসেবে। দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ১৯৯৩ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত – ২০০২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। বর্তমানে তিনি নির্বাহী কমিটির সদস্য। তিনি আন্তর্জাতিক নাট্যসংস্থা। ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (আই.টি.আই), বাংলাদেশ কেন্দ্রের নির্বাহী সদস্য এবং এর মনােড্রামা কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। সৈয়দ দুলাল এ যাবৎ চারবার আন্তর্জাতিক নাট্য সম্মেলনে যােগ দেন। ২০০০ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত আইটিআই’র আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশবরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও রামেন্দু মজুমদারের সাথে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি ভারত, ইতালি, রাশিয়া, ক্রোয়েশিয়া, জার্মানিতে বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত নাট্যোৎসবে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৪ সালে আর্মেনিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নাট্য সম্মেলনেও তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে অংশগ্রহণ করেন। নাট্যজন সৈয়দ দুলাল লিখিত নাটকগুলাের মধ্যে জীবন্ত পােস্টার ও একাত্তর এবং ইত্যাদি উল্লেখযােগ্য। তাঁর নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হওয়া নাটকগুলাের মধ্যে প্রখ্যাত

কথাসাহিত্যিক সেলিনা হােসেন-এর উপন্যাস অবলম্বনে সুনন্দ বাসার নাট্যরূপকৃত নীল ময়ূরের যৌবন নাটক সমকালীন নাট্যাঙ্গনের অনন্য দৃষ্টান্ত।

সৈয়দ দুলাল অভিনীত অসংখ্য নাটকের মধ্যে মেষ ও রাক্ষস, বাজলাে রাজার বারােটা, একজন নাবিক ও একটি শংখচিল, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। উল্লেখযােগ্য। শিশুদের টেলিভিশন অনুষ্ঠান সিসিমপুরে গুণী ময়রা চরিত্রে অভিনয় করে তিনি শিশুদের প্রিয়। মানুষে পরিণত হয়েছেন। নাটকে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নাট্যজন সৈয়দ দুলালকে ২০০৩ সালে ঢাকা নান্দনিক অজিত চট্টোপাধ্যায় পদকে ভূষিত করেন। এছাড়াও ঢাকা পদাতিক প্রবর্তিত আবুল কাসেম দুলাল পদক, ব্রজমােহন থিয়েটার প্রবর্তিত অশ্বিনী পদক, প্রজন্ম। নাট্যকেন্দ্র প্রবর্তিত বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘােষ পদক, অমৃত লাল দে সঙ্গীত একাডেমী প্রবর্তিত দানবীর অমৃত লাল দে পদক, সামাজিক প্রতিষ্ঠান সকাল-সন্ধ্যা পদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী প্রবর্তিত সম্মাননা-২০১৩ এবং ২০১৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার নাট্যপদক লাভ করেন। উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ সৈয়দ দুলালকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করেছে এভাবে – সৈয়দ দুলাল হলেন একজন বাংলাদেশী নাট্য ব্যক্তিত্ব ও টেলিভিশন অভিনেতা। তিনি বাংলাদেশে স্টুডিও থিয়েটারের প্রবর্তন করেন। ২০১২ সালের ২১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ থিয়েটার তাঁর তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন নাটকের ৮৫১টি প্রদর্শনী মঞ্চস্থ করেছে। এছাড়া, তিনি শিশুতােষ শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান সিসিমপুর-এ ‘গুণী ময়রা’ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য পরিচিত। সৈয়দ দুলাল বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন-সহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনে অগ্রগণ্য একা ব্যক্তিত্ব। ইতিবাচক ও সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাজের। প্রতি একাগ্রতায় সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি হয়ে উঠেছে অপরিহার্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে। সর্বোপরি তিনি মুক্তিযুদ্ধ-সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি এবং মানবতাবাদে প্রবাহিত জীবনধারায় একজন অসাম্প্রদায়িক বাঙালি। বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদ সৈয়দ দুলালকে শহিদ আলতাফ মাহামুদ স্মৃতিপদক-এ ভূষিত করতে পেরে আনন্দিত। তাঁর পথচলা অনেক দীর্ঘ হলে ঋদ্ধ হবে বরিশাল তথা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
 
Website Design and Developed By Engineer BD Network