৩০শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, শুক্রবার

নারী নির্যাতন বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

আপডেট: জুলাই ২, ২০২১

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

সনৎ কৃষ্ণ ঢালী, স্টাফ রিপোর্টার:

• নারীর প্রতি সহিংসতা বা নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা হচ্ছে সহিংস অপরাধগুলো যেগুলো প্রধাণত বা কেবলই নারী বা বালিকাদের উপরেই করা হয়। এরকম সহিংসতাকে প্রায়ই ঘৃণাপূর্বক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় । যা নারী বা বালিকাদের উপর করা হয় কেননা তারা নারী। নারীর প্রতি সহিংসতার খুব লম্বা ইতিহাস রয়েছে, যদিও এরকম সহিংসতার মাত্রা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ছিল, এমনকি আজও বিভিন্ন সমাজে এগুলোর মাত্রা ও ঘটনার ধরন বিভিন্ন হয়। এরকম সহিংসতাকে প্রায়ই নারীকে সমাজে বা আন্তঃব্যক্তি সম্পর্কে অধীনস্থ করার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ব্যক্তি তার অধিকারপ্রাপ্তির বোধ, উচ্চস্থানের বোধ, নারীবিদ্বেষ, বা নিজের সহিংস প্রকৃতির জন্য নারীর প্রতি সহিংস আচরণ করতে পারেন।জাতিসংঘের ডেকলারেশন অন দ্য ডেকলারেশন অফ ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন থেকে বলা হয়, “সহিংসতা হচ্ছে নারীর বিরুদ্ধে নারী ও পুরুষের মধ্যকার ঐতিহাসিক অসম ক্ষমতা সম্পর্কের প্রকাশ” এবং “নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা হচ্ছে প্রধান সামাজিক কৌশলগুলোর মধ্যে একটি যার দ্বারা নারীদেরকে পুরুষের তুলনায় অধীনস্থ অবস্থানে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া হয়”।

• জাতিসংঘের প্রাক্তন মহাসচিব কফি আনান ২০০৬ সালে ইউনাইটেড ন্যাশনস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর উইমেন (UNIFEM)-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ঘোষণা করেছিলেন:নারী ও বালিকাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা একটি পৃথিবীব্যাপি বিরাজমান সমস্যা। সমগ্র বিশ্বজুড়ে তিন জন নারীর অন্তত একজনকে মারা হয়েছে, জোরপূর্বক যৌনক্রিয়া করতে বাধ্য করা হয়েছে, বা অন্য কোনভাবে তার জীবনে যৌন নির্যাতন করা হয়েছে যেখানে নির্যাতনকারী কোনভাবে তার পরিচিত ছিল।

• নারীর প্রতি সহিংসতাকে কয়েকটি বৃহৎ শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। এগুলোর মধ্যে “ব্যক্তির” দ্বারা সহিংসতা ও “রাষ্ট্রের” দ্বারা সহিংসতা উভয়ই রয়েছে। সহিংসতার কোন কোন ধরন আছে যা ব্যক্তির দ্বারা ঘটে যথা – ধর্ষণ, গৃহ নির্যাতন, যৌন হয়রানি, প্রজননগত জোর-জবরদস্তি, কণ্যা শিশুহত্যা, লিঙ্গভিত্তিক গর্ভপাত, প্রসবকালীন সহিংসতা, উচ্ছৃঙ্খলা জনতার দ্বারা সহিংসতা বা দাঙ্গা, রীতি বা আচারগত চর্চা যেমন সম্মান রক্ষার্থে হত্যা বা অনর কিলিং, যৌতুক সহিংসতা বা পণ মৃত্যু, নারী খৎনা, অপহরণপূর্বক বিবাহ বা জোরপূর্বক বিবাহ। আবার কিছু কিছু ধরনের সহিংসতার কর্তা হচ্ছে রাষ্ট্র, যেমন – যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতা, সংঘর্ষের সময় যৌন সহিংসতা এবং যৌন দাসত্ব, বাধ্যতামূলক নির্বীজন, জোরপূর্বক গর্ভপাত, পুলিশ ও কর্তৃত্বকারী কর্মকর্তা বা কর্মচারীর দ্বারা সহিংসতা, পাথর ছুড়ে হত্যা বা চাবুক মারা। আবার অনেক ধরনের যৌন সহিংসতা সংগঠিত অপরাধ চক্রের দ্বারা, যেমন – নারী পাচার এবং জোরপূর্বক বেশ্যাবৃত্তি।

• বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নারীর জন্ম থেকে শুরু করে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত সকল পর্যায়ে নারীর প্রতি সহিংসতার বিভিন্ন ধরন নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে নতুন ধারা তৈরি হয়েছে যেখানে বিভিন্ন সম্মেলন বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বিভিন্ন ডিরেক্টিভ এর সাহায্যে আন্তর্জাতিক মাত্রায় এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে চাচ্ছে, যেমন যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে ডিরেক্টিভ, মানব পাচারের বিরুদ্ধে ডিরেক্টিভ। উল্লেখ্য, এখানে ডিরেক্টিভ বলতে কোন আন্তর্জাতিক সংঘের একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে তৈরি করা লক্ষ্যমাত্রাকে বোঝানো হয় যেখানে সংঘটির সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে সেই লক্ষ্যপূরণের উদ্দেশ্যে কাজ করতে হয়, কিন্তু সেই লক্ষ্যপূরণের উপায় সেখানে বলে দেয়া থাকে না।

• বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্র: বাংলাদেশের বেশিরভাগ নারী এবং মেয়েরা নানা মাত্রার লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতায় শিকার হচ্ছে। ২০১৫ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশের বেশি বিবাহিত মহিলা বা মেয়েরা সঙ্গীদের থেকে নানা মাত্রার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক বলেছে যে তাদের সঙ্গীরা তাদেরকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে এবং তবুও বেশিরভাগই বলেছে যে তারা কখনই কাউকে কিছু বলেনি এবং তিন শতাংশেরও কম ভুক্তভুগী আইনি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। বাংলাদেশে শুধু নারী নির্যাতনের কারণে প্রতিবছর ১৪ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা খরচ হয়, যা বাংলাদেশের মোট জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ।ইউনাইটেড নেশন পপুলেশন ফান্ডের জরিপে বলা হয়, নারীর ওপর তার পুরুষ সঙ্গীর শারীরিক নির্যাতনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। দেশে শতকরা ১৪ ভাগ মাতৃমৃত্যু ঘটছে গর্ভকালীন নির্যাতনের কারণে। শতকরা ৬১ জনের বেশি পুরুষ এখনও মনে করে স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতন করা বৈধ। এছাড়া, নারীর প্রতি শতকরা ৮০ ভাগ সহিংসতা ঘটে পরিবারের ভেতরে। অন্যদিকে দেশে সংঘটিত মোট খুনের ঘটনার ৫০ ভাগই হচ্ছে স্বামীর হাতে স্ত্রী হত্যার ঘটনা। নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটে গ্রামাঞ্চলে। শহরাঞ্চলেও শতকরা ৬০ ভাগ নারী স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হন। মৌখিক নিপীড়নের শিকার হন ৬৭ শতাংশ নারী। তাছাড়া যৌতুকের কারণে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে বছরে গড়ে ছয়শটি।দেশে নারীর প্রতি সহিংসতার বর্তমান পরিস্থিতি:স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার ৭২.৬% শারীরিক নির্যাতনের শিকার ৪৯.৬%,আইনগত পদক্ষেপ নেন ২.৬% ,স্ত্রীকে মারধর করা যায় মনে করেন ৩২.৫%, আত্মহত্যার চেষ্টা চালান ৭.১%।
দেশে ৭২ শতাংশ নারী তার নিজ পরিবারে সহিংসতার শিকার। অনলাইনে ৩৬ শতাংশের বেশি মেয়েশিশু বন্ধুদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।
৮ শতাংশের বেশি মেয়েশিশু অনলাইনে যৌন শোষণ, হয়রানি এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সাইবার বুলিং ও যৌন আবেদনমূলক কনটেন্টের মুখোমুখি হয়েছে প্রায় ৮ শতাংশ শিশু। অনলাইনে ২৩ শতাংশ মেয়েশিশু যৌন কনটেন্টের মুখোমুখি হয়েছে। অনলাইরন ৪৬ শতাংশ অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব পেয়েছে।

• সহিংসতার কারণ: নারীর প্রতি সহিংসতার নানাকারণ বিদ্যমান।দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অশিক্ষাসহ নানা কারণে নির্যাতিত হচ্ছে নারীরা। যৌতুকের দাবি মেটাতে না পেরে অসংখ্য নারীর জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। যৌতুক, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, তালাকসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিদ্যমান আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ
নেই। তাছাড়া এসব আইন সম্বন্ধে সাধারণ মানুষ সচেতনও নয়।নারীর ওপর সহিংসতার আরেকটি কারণ তাদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। নারী নিজ পরিবারেও নির্যাতিত হচ্ছে। পরিবার পেড়িয়ে বাইরেও নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাদের। অনেক নারী চাইলেও নিজ পরিবারের কাছেও সহিংসতার কথা বলতে পারেন না। দেখা যায়, অনেক সময় পরিবারই নির্যাতিত নারিকে দোষী সাব্যস্ত করে। বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায় সহিংসতার শিকার অনেক নারী চাইলেও আইনের আশ্রয় নিতে পারেন না। পরিবার ও সন্তানের কথা ভেবে অনেক নারীই এসব অত্যাচার সহ্য করেন বাধ্য হয়ে।নারীর প্রতি সহিংসতার বিভিন্ন কারণগুলোর মধ্যে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্যই প্রধান। সামাজিক কুপ্রথা ও দৃষ্টিভঙ্গি দারিদ্র্য, বেকারত্ব, নিরাপত্তার অভাব, বালাবিবাহ, বহুবিবাহ, যৌতুক, আইন ও আইনগত অধিকার সম্পর্কে নারীদের অসচেতনতা, আইন ও বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রভৃতি নারীর প্রতি সহিংসতার গুরত্বপূর্ণ কারণ।বাংলাদেশে ধর্ষণের চিত্র আরও ভয়াবহ। ধর্ষণ হলো বেআইনী যৌন ক্রিয়াকলাপ। সাধারণত জোর করে কোন ব্যক্তির ইচ্ছার বিরুদ্ধে আঘাতের হুমকির মধ্যমে যৌন মিলনে বাধ্য করা। ধর্ষক, সন্ত্রাসী, খুনি, মাফিয়াচক্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় থাকে বলে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে সারা দেশে ধর্ষণসহ অপরাধমূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে। এর ফলে প্রান্তিক নারী বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের নারীরাই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে বেশি। বিচারিকের দাবিতে ধর্ষণের শিকার নারী ও মেয়েশিশু আইনি সহায়তা পায় না। অপরাধী জামিনে খালাস পেয়ে ভিকটিমকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। তারা ভিকটিমের পুরো পরিবারকে জিম্মি করে রাখে।

• অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের দিক দিয়ে বাংলাদেশ গতবারের ১৩৫তম অবস্থান থেকে ছয় ধাপ এগিয়ে ১২৯তম অবস্থানে উঠে এসেছে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও বৈষম্য আরও কমে এসেছে, সূচকের ১১৪তম স্থান থেকে বাংলাদেশ উঠে এসেছে ১১১তম
স্থানে।
কিন্তু স্বাস্থ্য সেবাপ্রাপ্তিতে স্কোর বাড়লেও অন্যান্য দেশ বেশি সাফল্য পাওয়ায় এ দিক দিয়ে বাংলাদেশ ৯৩ থেকে চলে গেছে ১২৫তম স্থানে।
ডব্লিউইএফ বলছে, গত এক দশকে নারী-পুরুষ বৈষম্য কমাতে বিশ্ব ভালো অগ্রগতি দেখালেও সেই গতি এখন ধীর হয়ে এসেছে। বৈশ্বিক স্কোর গতবছরের ০.৬৮৩ থেকে কমে হয়েছে ০.৬৮০।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ধারায় এগোলে বিশ্ব থেকে লিঙ্গ বৈষম্য দূর হতে ১০০ বছর সময় লাগবে।ওই গবেষণার তথ্যে দেখা যায়, নারীদের মধ্যে যাঁরা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না বলে জানিয়েছেন, তাঁদের ৯৫ দশমিক ৪ শতাংশ বলেছেন, তাঁদের ইন্টারনেট ব্যবহারের অনুমতি নেই। অথচ এর বিপরীতে এমন পুরুষের হার মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে, নিরাপত্তার কারণে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না—এমন বলা পুরুষ মাত্র ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, কিন্তু নারী ৯৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এখান থেকে স্পষ্ট হয়, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে নারীরা পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যায়, ২৯ শতাংশ পুরুষ বলেছেন, তাঁরা সময়ের অভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না, কিন্তু এর বিপরীতে নারীর হার ৭১ শতাংশ। জনপরিসরে বাণিজ্যিকভাবে ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী স্থানগুলোয় (যেমন টেলিসেন্টার বা সাইবার ক্যাফে) গিয়ে এই সেবা গ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে সিংহভাগই (৮০.৬%) পুরুষ।সূচনা বক্তব্যে কেয়ার বাংলাদেশের প্রমোটিং ওয়ার্কার ওয়েল বিইং প্রজেক্টের টিম লিডার বাবুল আজাদ বলেন, ৬ কোটি ৩৫ লাখ শ্রমিকের মধ্যে ২ কোটি নারী শ্রমিক, যা ৩২ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নারীশিক্ষা, রাজনীতি ও মাতৃমৃত্যুর হার রোধে অনেক অগ্রগতি হলেও কর্মক্ষেত্রে হয়রানি সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ আরো উন্নত করা দরকার।করোনাকালে নারী ও শিশুর প্রতি যত ধরনের নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে অঘোষিত লকডাউনের সময় বিপুলসংখ্যক নারী ও শিশু পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। এই বছরের প্রথম দুই মাসের বেসরকারি পরিসংখ্যানেও এমনটাই দেখা গেছে। নারী ও কন্যার নিরাপত্তা বহু দশক ধরেই ঘরে এবং বাইরে অরক্ষিত। বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতায় কঠোর আইনগুলোও নারী ও শিশুর জন্য সুরক্ষাকবচ হয়ে উঠতে পারেনি। বলা হয়, প্রান্তিক গোষ্ঠী আর্থিক সংকটে নিপীড়নের শিকার হয় বেশি। তবে সম্প্রতি পরিচিত গণ্ডির মধ্যে কলাবাগানে স্কুলছাত্রী এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে আসছে বিভিন্ন মহলে।

• সহিংসতা বাড়ার পূর্বাভাস ছিল: করোনার বিস্তারে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের অর্থনীতি যখন মুখ থুবড়ে পড়তে শুরু করেছিল, কর্মহীন হয়ে পড়েছিল যখন কোটি মানুষ, তখন জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে শঙ্কা প্রকাশ করে জানানো হয়েছিল, এ ধরনের পরিস্থিতিতে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়বে। ঝুঁকিতে পড়বে নারী ও মেয়েশিশুর প্রজনন স্বাস্থ্য। ‘ইমপ্যাক্ট অব দ্য কোভিড ১৯ প্যানডেমিক অন ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যান্ড এনডিং জেন্ডার বেজড ভায়োলেন্স ফিমেল জেনিটাল মিউটিলেশন অ্যান্ড চাইল্ড ম্যারেজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনও প্রকাশ হয় সেই সময়।

• কোভিড ১৯-এর আক্রমণের শুরুতে নারীর অবস্থা কেমন ছিল তা নিয়ে জরিপ করে উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। ব্র্যাকের জরিপের তথ্যানুযায়ী ৯১ শতাংশ নারী বলছেন, বাসায় তাদের কাজের চাপ বেড়েছে। ৮৯ ভাগ নারী বলছেন অবসর বলে কিছু নেই। সারা দিন ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। গৃহস্থালীল কাজ, বয়স্কদের সেবাযত্ন, ছোটদের খেয়াল রাখাসহ যারা সচরাচর বাসায় থাকেন না তাদেরও দেখভাল করতে গিয়ে নিজের সময় বলে কিছু থাকছে না। জরিপে তৃণমূল থেকে নেওয়া তথ্য বলছে এ সময়ে সহিংসতার শিকার হয়েছে ৯১ ভাগ নারী ও কন্যাশিশু। ৮৫ ভাগ নির্যাতনকারী ঘরের মধ্যেই ছিল।

• বাংলাদেশে শঙ্কা: বাংলাদেশে ওই শঙ্কা সত্য প্রমাণ হতে দেখা যায় বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলা হচ্ছে, বিদায়ী বছরে দেশে লকডাউনকালে উল্লেখযোগ্য হারে নারীরা শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেক নারী ও শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার খবর এসেছে। স্কুল বন্ধ থাকায় বাল্যবিবাহও থেমে থাকেনি। বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন কয়েক দফা জরিপে জানায়, এমন অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছে যারা আগে কখনও নির্যাতনের শিকার হয়নি।

• আইন শক্ত হলেও ধর্ষণ কমেনি: এই বছর ১৩ অক্টোবর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে অধ্যাদেশে সই করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি এতদিন ছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে বা দলবেঁধে ধর্ষণের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। এ আইনে শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করার পাশাপাশি দ্রুতবিচার ও রায় কার্যকর করার জন্য আইন সংশোধনের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। কিন্তু তাতে শেষ রক্ষা হচ্ছে? সেই বিতর্কও শুরু হয়েছে।

• বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মোট ১ হাজার ২৪৬ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১ হাজার ৩৪৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে শিশু-কিশোরীই বেশি যাদের বয়স ৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে।

• নভেম্বরের শেষে দেশের ৫৯ জেলার ১০ লাখ নারীর অংশগ্রহণে করা এক জরিপে দেখা যায়, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪০ হাজার নারী পারিবারিক সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যাদের মধ্যে ৪০ শতাংশ নারী প্রথমবারের মতো নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, লকডাউন চলাকালে নারীর ওপর সহিংসতার মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। জরিপে দেখা গেছে, পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও মানসিক নির্যাতনের মাত্রা বেশি।বেসরকারি সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালের মার্চ থেকে জুনে বাল্যবিবাহ হয়েছিল ৩৮টি। এই হিসাবে গতবছরের তুলনায় এ বছরের এ চার মাসে বাল্যবিবাহ বেড়েছে ছয়গুণের বেশি। গবেষণা বলছে, ৮৫ শতাংশ বাল্যবিবাহ ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক অনিরাপত্তার জায়গা থেকে দেওয়া হয়েছে। ৭১ শতাংশ দেওয়া হয়েছে স্কুলের অনিশ্চয়তার কারণে। ৬১ শতাংশ দেওয়া হয়েছে ‘ভালো পাত্র’ সহজে পাওয়া যাওয়ার কারণে।

• বিশ্বের যেসব দেশে স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নারী নির্যাতনের হার বেশি, সেসব দেশের তালিকায় এসেছে বাংলাদেশের নাম। দেশের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৫০ শতাংশই জীবনে কখনো না কখনো সঙ্গীর হাতে শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিশ্বের ১৬১টি দেশ ও অঞ্চলে ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নারী নির্যাতনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তাদের তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতি তিনজন নারীর একজন জীবদ্দশায় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।স্বামী অথবা সঙ্গীর হাতে নারী নির্যাতনের হার সবচেয়ে বেশি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশ কিরিবাতিতে। দরিদ্র এ দেশে ৫৩ শতাংশ নারীই এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন। এরপর রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় আরও দুটি দ্বীপদেশ ফিজি (৫২ শতাংশ) ও পাপুয়া নিউগিনি (৫১ শতাংশ)। বাংলাদেশে ৫০ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার হন। হারটি সলোমন দ্বীপপুঞ্জের ক্ষেত্রেও একই।প্রতিবেদনে আলাদাভাবে করোনা মহামারির মধ্যে সর্বশেষ ১২ মাসে স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নারীর শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এ তালিকায়ও ১৬তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। করোনাকালে দেশে ২৩ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। করোনাকালে নির্যাতনের হার সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে আর্থসামাজিক দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকা আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে, ৩৬ শতাংশ। এর পরে দ্বিতীয় আফগানিস্তান (৩৫ শতাংশ) এবং তৃতীয় পাপুয়া নিউগিনি (৩১ শতাংশ)।করোনা মহামারির মধ্যে সবচেয়ে কম, ৪ শতাংশ পর্যন্ত নারী নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে তালিকার শেষের দিকে অবস্থান করছে ৩০টি দেশ ও একটি অঞ্চল। এর মধ্যে ২৪টি দেশ হচ্ছে উচ্চ আয়ের। ৩০টি দেশের মধ্যে ২৩টি ইউরোপের। বাকি আটটি হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, উরুগুয়ে, কানাডা ও হংকং। শেষের দুটি দেশে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে মাত্র ৩ শতাংশ। বাকিগুলোতে ৪ শতাংশ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র ৬ শতাংশ নারী নির্যাতনের বিষয়ে অভিযোগ করে থাকেন। সম্মানের কথা ভেবে বেশির ভাগই চুপ থাকেন। তাই নির্যাতনের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হবে বলেই ধারণা করা হয়।

তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশ ও সুযোগ–সুবিধার মধ্যে থেকেও ওই মেয়েদের জীবন কেন সংকটে পড়ল? সংকট কি বন্ধু নির্বাচনের অপরিপক্বতা, অভিভাবকদের যথাযথ নজরদারির অভাব, উঠতি বয়সীদের জন্য সুষ্ঠু বিনোদনের ব্যবস্থা করতে না পারা, নাকি মূল্যবোধের অভাব! এই সংকটের সম্ভাব্য সমাধান কী হতে পারে? নারীমঞ্চ কথা বলেছে কয়েকজনের সঙ্গে।
• নারী ও শিশুর প্রতি পুরুষের অপরাধপ্রবণতা ও করোনার সময়েও এ ধারা অব্যাহত থাকার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, করোনাকালে অর্থনৈতিক সংকট থেকে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক অনুভূতি বেড়ে যেতে দেখা গেছে। তিনি বলেন, নারীর জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতিতে, বিশেষ করে সম্পদের ওপর অধিকারের ক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা নেই। কোনো শিশু যখন আশপাশে এমন অবস্থা দেখে বড় হয়, তখন সে নিজেকে ক্ষমতায়িত মনে করে। পরিবারে মা ও মেয়েদের প্রতি বাবার সহিংস আচরণ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়ায়।এই অধ্যাপক আরও বলেন, এ দেশে সামাজিক কাঠামোও ধর্ষণের জন্য ‘উর্বর’ জায়গা।
স্কুলপর্যায়ে যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় শিশুদের মধ্যে যৌনতা বিষয়ে নানা ধরনের ভাবনা কাজ করে। এ থেকে কিশোরদেরও ধর্ষণ ও পর্নোগ্রাফির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
• আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক নিনা গোস্বামী প্রথম আলোকে বলেন, এ বছর পারিবারিক সহিংসতা ও ধর্ষণ—এ দুটি নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটেছে।পারিবারিক সহিংসতা বেশি ঘটার কারণ ছিল করোনাকালে অঘোষিত লকডাউনের সময় ঘরের কাজ, মুঠোফোনে কথা বলা, শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে বেশি যোগাযোগ ইত্যাদি নানা ছোটখাটো ইস্যুতে অসহিষ্ণুতা, খিটিমিটি, ঝগড়া থেকে স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। আর ধর্ষণের বিষয়টি দীর্ঘদিনের ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করার পরিণতি। ধর্ষণের মামলার মাত্র ৩ শতাংশের বিচার হয়। ফলে সমাজে এ বার্তা নিশ্চিত করা যায়নি যে ধর্ষণ করলে কঠোর সাজা হতে পারে। বিচার নিশ্চিত করা না গেলে মৃত্যদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ সাজার বিধান রেখে কোনো লাভ নেই বলে মনে করেন তিনি।
করোনার কারণে ২০২০ সালের মার্চে সাধারণ ছুটি শুরু হওয়ার পর থেকে নারীর প্রতি সহিংসতার সংখ্যা ও মাত্রা বাড়তে থাকে। একের পর এক নির্যাতনের ঘটনায় দেশের বড় বড় বেসরকারি সংস্থা থেকে শুরু করে মানবাধিকার সংস্থা সবাই দেশব্যাপী নানা গবেষণা করেন। গবেষণা তথ্য বলছে, করোনার এই সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। নারী প্রতিকারও পেয়েছে কম। বেড়েছে প্রতারণাসহ নানা ধরনের অপরাধ ও বাল্যবিবাহ।
• অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, করোনার শুরুর দিকে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও সব থমকে গিয়েছিল। অপরাধীরাও কিছুটা থমকে গিয়েছিল। কিন্তু এখন তারা আগের মতো সক্রিয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘নারীর প্রতি নির্যাতন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কারণ, বড় একটা সময় আমরা নিজেরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত হয়েছিলাম। ফলে নারী যে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে সেদিকে নজর যায়নি। ভয়াবহ আরেকটি দিক যুক্ত হয়েছে এই নির্যাতনের সঙ্গে। সেটি হলো, এই সময়ে অপরাধের বিচার চেয়ে নারী সহসা বাইরেও যেতে পারেনি।’

• মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম মনে করেন, অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা পুরুষকে নানা অসদাচরণ করতে প্ররোচিত করেছে। এ কারণে করোনাকালীন নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে।মহামারির মধ্যেও কেন এই আচরণ? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সহিংসতা হলো হতাশ পুরুষের ব্যর্থতা ঢাকার নির্মম উপায়। শুরু থেকেই আমি নানা ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচি, কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার ওপর জোর দিয়ে আসছিলাম। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় আমাদের সমাজ নারীর ওপর স্বাভাবিক সময়েই নির্যাতন নিপীড়ন চালায়। সেখানে যে সময়টাকে আপনি চেনেন না, যে সময় আপনার মধ্যে অনিরাপত্তার বোধ জাগ্রত হচ্ছে, তখন বাড়তি সতর্ক না থাকায় যা হওয়ার সেটাই হয়েছে করোনাকালে বাংলাদেশে নারী নির্যাতন।

• বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের উচ্চ হারের জন্য মানসিকতার ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক। তিনি বলেন, দেশে পুরুষতন্ত্র এমন পর্যায়ে যে নারীরাও পুরুষ সঙ্গী ছাড়া নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। এর ফলে সামাজিকভাবে নারীর চেয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল অবস্থানে থেকেও ওই পুরুষ নিজেকে শক্তিশালী ভাবতে শুরু করেন। পুরুষকে উঁচু করে তোলার ভাবনা তাঁকে বিভিন্ন অপকর্মেও উৎসাহিত করে।

• মহামারির মধ্যে বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের প্রসঙ্গে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম’–এর প্রকল্প পরিচালক আবুল হোসেন বলেন, করোনাকালে বাইরে ঘোরাঘুরি কমে গেছে। দীর্ঘ সময় ঘরে থাকার কারণে নানা দুশ্চিন্তা থেকে পুরুষের সহিংস হয়ে ওঠার ঘটনা ঘটেছে। সহিংসতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে স্ত্রী বা সন্তানকে নির্যাতন করে।
তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ হিসাবের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে পারছেন না তিনি। আবুল হোসেন বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মাপকাঠিতে সহিংসতার পরিমাপ করে। স্ত্রী–সন্তানকে ধমক দেওয়াকে তারা নির্যাতন বলে বিবেচনা করে। আমাদের সামাজিক কাঠামোয় যা প্রযোজ্য নয়।’

• নারী নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেন, প্রতিটি দেশ ও সংস্কৃতিতে নারীর প্রতি সহিংসতা ঘটে চলেছে। এতে কোটি কোটি নারী ও তাঁদের পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারিতে নির্যাতন আরও বেড়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা কোভিড-১৯–এর মতো টিকায় থামবে না। সরকার, সমাজ ও ব্যক্তির দৃঢ় এবং কার্যকর ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এর বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব। ক্ষতিকর আচরণ পরিবর্তন করতে হবে, নারীর জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে এবং সম্পর্কে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে ।

• বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নারীর অবদান এবং নারীসমাজের ভূমিকা সর্বজনস্বীকৃত। কিন্তু নারীর ওপর সহিংসতাসহ নারী নির্যাতন এবং নারীর প্রতি বৈষম্য দেশে এখনও বিদ্যমান। বাল্যবিয়ে, বহুবিবাহ, যৌতুক, তালাক, অ্যাসিড নিক্ষেপ, নারী ও শিশু পাচার, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ এবং পারিবারিক নির্যাতনের মতো ঘটনা সমাজে এখনও প্রতিনিয়ত ঘটছে। সহিংসতা প্রতিরোধে সর্বপ্রথমে নিজেকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বাংলাদেশ সরকার কন্যাশিশু ও নারীর অগ্রযাত্রাকে চলমান রাখতে বিভিন্ন নারীবান্ধব নীতিমালা ও আইন প্রবর্তন করেছে। সম্প্রতি নারী ও শিশু নির্যাতন, তথ্য ও সেবা প্রদান এবং জরুরি সেবার জন্য করমুক্ত ন্যাশনাল হেল্পলাইন নাম্বার ১০৯, ৩৩৩ ও ৯৯৯ কার্যকর রয়েছে। এগুলো যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পারে সেজন্য এই তিনটি হেল্পলাইন নাম্বার একটি ছাতার নিচে আনা হয়েছে। নারী নির্যাতনের মাশুল শুধু নারীরাই দেয় না; গোটা পরিবার, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রকেও পিছিয়ে পড়তে হয় অনেক ক্ষেত্রে। সে ক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে পুরুষদের ইতিবাচক মনোভাব ও অংশগ্রহণের বিকল্প নেই।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
   
Website Design and Developed By Engineer BD Network