৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার

বঙ্গবন্ধুকে দাফনের আগেই দুই রাষ্ট্রপতি,স্পীকারসহ ২১ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হয়ে যান খুনী মোশতাকের!

আপডেট: আগস্ট ৪, ২০২১

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

সোহেল সানি:

“লন্ডনের রাস্তায় আমার শবদেহ পড়ে থাকবে, তবু পাকিস্তানের সঙ্গে আপোস করে দেশে ফিরব না।”
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ১৯৭১ সালের ২৭ আগস্ট মুজিবনগর সরকারের বৈদেশিক দূত হিসাবে সংবাদপত্রকে এ কথা বলেছিলেন।
হাইকোর্টের বিচারপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদত্যাগী ভিসি আবু সাঈদ চৌধুরীর ওই বীরত্বের কথা শুনে বঙ্গবন্ধু এতটাই বিমুগ্ধ হন যে, বঙ্গবন্ধু নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়ে রাষ্ট্রপতি পদটি তাঁকে উপহার দেন।
অদৃষ্টের লিখন ‘৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু প্রায় সপরিবারে নিহত হন। বাকশাল মন্ত্রিসভার ২১জন সদস্য রাষ্ট্রপতি হিসাবে মোশতাকের আনুগত্য প্রকাশ করেন মন্ত্রীত্বের টোপ গেলেন।
বঙ্গবন্ধুর সেই প্রিয় রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী যাদের মধ্যে অন্যতম। এক সপ্তাহ আগে বঙ্গবন্ধুর কাছে নৌপরিবহন মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন তিনি।
মোশতাক কথিত মুজিবপ্রেমিক বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরীকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মন্ত্রী করেন। আর তখনো দেশের বাইরে বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ কামাল হোসেন! মোশতাকের ৮৩ দিনের রাজত্বের অবসান ঘটলে লন্ডনে গিয়ে মুখ খোলেন বিচারপতি চৌধুরী। বলেন,”না গিয়ে উপায় ছিলো না, তা না হলে হয়ত প্রাণ দিতে হতো অথবা গ্রেফতারবরণ করতে হতো।”
তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন
বঙ্গবন্ধুর ছবি বুকে ধারণ করে থাকতেন এ শিক্ষাবিদ বিচারপতি। সেই তার মুখে শুনতে হয়েছে “ভাগ্যে লেখা ছিলো, তাই ওমন হয়েছে!”
বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হবার পর গণভবনে যান। বিদায় প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু দেখতে পান রাষ্ট্রপতি একটি ছোট গাড়িতে চড়েন। প্রধানমন্ত্রী মুজিব তাঁর ব্যবহৃত ক্যাডিলাক গাড়িটি রাষ্ট্রপতির জন্য পাঠান। রাষ্ট্রপতি হিসাবে বঙ্গবন্ধু গাড়িটি বরাদ্দ পান। কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। তাই গাড়িটি বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতির জন্য পাঠান। কিন্তু রাষ্ট্রপতি তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফেরত পাঠান একখানা পত্র লিখে। তাতে রাষ্ট্রপতি লিখেন, ” বাংলার বন্ধু, আমার প্রিয় নেতা, এই গাড়িটি জাতির পিতা ব্যবহার করবেন। গাড়ি আপনি ফেরৎ না নেয়া পর্যন্ত আমি অস্বস্তিবোধ করবো- প্রীতিমুগ্ধ আবু সাঈদ চৌধুরী।” মধুর সম্পর্ক তবে স্থায়ী হলো না কেনো? জানা যায়, মওলানা ভাসানী সরকারের বিরুদ্ধে অনশনে। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুকে বলেন, মওলানা ভাসানী আমার পিতৃবন্ধু। তাঁকে দেখতে যেতে চাই। বঙ্গবন্ধু বলেন, “আপনি তাঁকে দেখতে বাসায় যেতে পারেন, রাজনৈতিক কার্যালয়ে যেতে পারেন না।” এতে কষ্ট অনুভব করেন রাষ্ট্রপতি।
‘৭৩ সালের ২১ মে ভাসানী হাসপাতালে ভর্তি হলে রাষ্ট্রপতিকে বঙ্গবন্ধু বলেন, এখন যেতে পারেন।
আরও একটি ঘটনা ঘটছিলো। ‘৭৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী রেসক্রস সোসাইটির চেয়ারম্যান গাজী গোলাম মোস্তফার একটি নথি পাঠান রাষ্ট্রপতির কাছে স্বাক্ষরের জন্য। রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকেন। উপরন্তু ২২ ডিসেম্বর খুলনা ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সারাদেশে দুনীর্তির ব্যাপকতা সম্পর্কে সরকারের সমালোচনা করেন। রাষ্ট্রপতি ঢাকায় ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ফোনে কথা বলতে চান। রাষ্ট্রপতি গাজী গোলাম মোস্তফার নথিতে সাক্ষর না দেয়ার বিষয় কথা বলবেন, এমনটা আন্দাজ করে রিসিভার কানে তুলে এ প্রান্ত থেকে আগেই বলে ওঠেন, ” বঙ্গবন্ধু আপনার সাথে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক থাক,আমাকে রেহাই দিন।”
সরকারের ভাবমূর্তি রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তারপরও তাঁকে পদত্যাগ না করার জন্য বলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু তিনি পদত্যাগ করেন।
তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব পূর্ণমন্ত্রীর সমমর্যাদায় আবু সাঈদ চৌধুরীকে সরকারের বিশেষদূত করেন। এভাবে তাঁকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে জনমনে সৃষ্ট গুজব-গুঞ্জণের অবসান ঘটাতে হয়।
‘৮৫ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরী। কিন্তু জাতির পিতা হত্যার বিচারের প্রশ্নে কি একটি শব্দ উচ্চারণ করেননি। ‘৮৭ সালে সেই শোকাবহ আগস্টে ২ তারিখে লন্ডনের আর্লসকোর্স আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনে নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের এই সাবেক রাষ্ট্রপতি। ৫ আগস্ট তাঁর মৃতদেহ ঢাকা হয়ে টাঙ্গাইলের নাগবাড়িতে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।
“মোহাম্মদ উল্লাহ”
আলংকারিক অর্থে হলেও রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান। বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি হন তৎকালীন স্পিকার মোহাম্মদ উল্লাহ। সেই রাষ্ট্রপতিই আবার উপরাষ্ট্রপতি হওয়ার নজির সৃষ্টি করেন মোহাম্মদ উল্লাহ।
‘২১ সালে জন্মগ্রহণকারী মোহাম্মদ উল্লাহ পঞ্চাশ দশকের শুরুতে তরুণ আইনজীবী। ৯০ নবাবপুরে আওয়ামী মুসলিম লীগের এক রুমের অফিস। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। মোহাম্মদ উল্লাহ নিজ থেকেই দলের সভ্য হতে চান। শেখ মুজিব তাঁকে স্বাগত জানান সদস্য পদে নিয়োগ দিয়ে। দলের সভাপতি ভাসানী ও সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক কারাগারে। ‘৫০ সালের শুরুতেই কারামুক্ত হয়ে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসাবে শেখ মুজিব দলীয় অফিসটি চালু করেন। দুটা টুল, একটা টেবিল ও দুটা চেয়ার এই ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ অফিসের আসবাবপত্র। নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি দলের প্রতিষ্ঠাতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। তাঁর অনুরোধে একবন্ধু অফিসের জন্য একটি টাইপ মেশিন কিনে দেন। মুহম্মদুল্লাহ টাইপ মেশিনটি ব্যবহার করেন দলের কর্মসূচি ও বক্তৃতা-বিবৃতি তৈরির জন্য। বেশ পারদর্শীতার প্রমাণ দেন মোহাম্মদ উল্লাহ। দফতর সম্পাদক করা হয় প্রথম কাউন্সিলে- ১৯৫৩। এ কাউন্সিলেই শেখ মুজিব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ‘৫৩-‘৭২ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক হিসাবে মোহাম্মদ উল্লাহর তুলনাভার। প্রথম জাতীয় সংসদে তাকে স্পিকার করা হয়। এরপর ‘৭৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর মুহম্মদুল্লাহ রাষ্ট্রপতি। ‘৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি মুহম্মদুল্লাহকে পদত্যাগ করতে হবে। ওদিন কাজী নজরুল ইসলামকে বঙ্গভবনে আনা হয়েছে। জাতীয় কবি হিসেবে অনারারি ডক্টরেটসহ স্বর্ণপদক উপহার দেয়ার আয়োজন। সকাল ১০টায় অনুষ্ঠান শুরু বঙ্গভবনে।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
   
Website Design and Developed By Engineer BD Network