২৫শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার

বানারীপাড়ায় বিসিআইসির ক্ষতিপূরণ দিতে হবে – চার সদস্যের তদন্ত কমিটি

আপডেট: নভেম্বর ২৬, ২০২১

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

চার দিনেও উদ্ধার হয়নী ডুবে যাওয়া বাল্কহেড

জি.এম রিপন,বানারীপাড়া
বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীতে বিসিআইসির ৬৪০০ বস্তা ইউরিয়া সারসহ এম.ভি আব্দুর রহমান-২ বাল্কহেড ডুবে যাওয়ার ঘটনায় সার সর্বরাহকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান পোটোন ট্রেডার্সকেই বিসিআইসির ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। বুধবার এ বিষয়টি নিশ্চিত করে বরিশাল বিসিআইসির পাঁচ জেলার দায়ীত্বেরত কর্মকর্তা আব্দুর রহিম খন্দকার জানান। তিনি জানান, তারা সরকারী নিয়ম অনুযায়ী বিসিআইসির সার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহন করার জন্য সর্তসাপেক্ষে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ করে থাকেন। এক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী ওই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে বিসিআইসির সঙ্গে সার পরিবহনের সমপরিমান মূল্য বিসিআইসির সরকারী কোষাগারে জমারাখার চুক্তিবদ্ধ হতে হয়।
সে অনুযায়ী সার সর্বরাহকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান যদি এক স্থান থেকে সুনিদৃষ্ট স্থানে ওই সার পরিবহন করতে না পারেন, সে জন্য সর্তঅনুযায়ী সেই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে জামানত হিসেবে সরকারী কোষাগারে জমা রাখা টাকা থেকে নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ হিসেবে সারের সমপরিমান মূল্য বিসিআইসির সরকারী কোষাগারে কেটে রাখা হয়। এক্ষেত্রে যশোরের নওয়াপাড়া থেকে বিসিআইসির ইউরিয়া সরবারাহ করার জন্য পোটোন ট্রেডার্স নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কন্টাক নেয়।
বিসিআইসির সর্ত অনুযায়ী নওয়াপাড়া থেকে তাদের ওই ইউরিয়া সার উজিরপুর উপজেলার শিকারপুর হয়ে নিদৃষ্ট গন্তব্যে পৌছে দেয়ার কথা। এক্ষেত্রে উক্ত প্রতিষ্ঠান বিসিআইসির সেই ইউরিয়া সার সুনিদৃষ্ট গন্তব্যে পৌছে দিতে পারেননী। ২২ নভেম্বর তাদের চুক্তিভিত্তিক সেই ইউরিয়া সার বোঝাই এম.ভি আব্দুর রহমান-২ বাল্কহেডটি সন্ধ্যা নদীতে ডুবে যায়। এক্ষেত্রে সর্তঅনুযায়ী বিসিআইসির সেই ইউরিয়া সার সর্বরাহকারী প্রতিষ্ঠান পোটোন ট্রেডার্সকেই এর ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

অপরদিকে বানারীপাড়ার সন্ধ্যা নদীতে বিসিআইসির ৬৪০০ বস্তা ইউরিয়া সারসহ এম.ভি আব্দুর রহমান-২ বাল্কহেড ডুবীর ঘটনায় দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য বরিশাল জেলা প্রশাসক মো.জসীম উদ্দীন হায়দার চার সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। ২৪ নভেম্বর জেলা প্রশাসক মো.জসীম উদ্দীন হায়দার স্বাক্ষরিত ওই তদন্ত কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রের্ট মো.রকিবুর রহমান খাঁনকে আহবায়ক ও বরিশাল বিআইডব্লিউটিএর নদী বন্দর কর্তৃপক্ষের যুগ্ম-পরিচালক মো.মোস্তাফিজুর রহমান, বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপন কুমার সাহা এবং থানার অফিসার ইনচার্জ মো.হেলাল উদ্দিনকে সদস্য করা হয়েছে। তারা সন্ধ্যা নদীতে ডুবে যাওয়া এম.ভি আব্দুর রহমান-২ বাল্কহেডটি উদ্ধারের পর এব্যাপারে দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পাবেন বলে ওই কমিটির সদস্য ও বরিশাল বিআইডব্লিউটিএর নদী বন্দর কর্তৃপক্ষের যুগ্ম-পরিচালক মো.মোস্তাফিজুর রহমান জানান।

এদিকে বানারীপাড়া সন্ধ্যা নদীতে বিসিআইসির সারসহ সন্ধ্যা নদীতে ডুবে যাওয়া বাল্কহেডের ঘটনাস্থল পৃথক ভাবে পরিদর্শন করেছেন বিসিআইসির উপ-মহাব্যাবস্থাপক (ডিজিএম) মো.সাইদুর রহমান ও বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপন কুমার সাহা। বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টায় তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে এব্যাপারে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপন কুমার সাহা জানান।

অপরদিকে বানারীপাড়ার সন্ধ্যা নদীতে ডুবে যাওয়া বাল্কহেডটি গত চার দিনেও উদ্ধার করা হয়নী। এছাড়া বাল্কহেডটির তলা ফেটে ডুবে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে রহস্য থাকতে পারে বলে স্থানীয়রা ধারনা করছেন। তারা এব্যাপারে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবী জানিয়েছেন।

এব্যাপারে স্থানীয় খোদাবখসা দাখিল মাদরাসার সহকারী শিক্ষক ও গোয়াইবাড়ি ২নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মা.মোবারক আলী শিকদার জানান, ২১ নভেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তিনি সন্ধ্যা নদীর তীর ঘেষে এম.ভি আব্দুর রহমান-২ নামের একটি অর্ধবোঝাই বাল্কহেড নঙ্গর করা দেখতে পান। পরদিন ২২ নভেম্বর সকালে তিনি বাড়ি থেকে বেরহয়ে ওই বাল্কহেডটি পূর্বের দিনের চেয়ে অনেকটা খালি দেখতে পান। পরে তিনি মাদরাসায় চলে যান। সেখানে থাকা অবস্থায় তিনি জানতে পারেন, ওই দিন সকাল অনুমান সাড়ে ১০টার দিকে সেই বাল্কহেডটির তলা ফেটে সন্ধ্যা নদীর মাঝে পিছন দিক থেকে আস্তে আস্তে (দীর্ঘ সময় নিয়ে) ডুবে যায়। এসময় স্থানীয় জেলেদের সহায়তা এম.ভি আব্দুর রহমান-২ বাল্কহেডের সুকানীসহ তিন জন তীরে উঠতে সক্ষম হন। এসময় স্থানীয়রা বাল্কহেডেটির ডুবে যাওয়া দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে রাখেন। পরে সেটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়।
এব্যাপারে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা মা.মোবারক আলী শিকদারসহ একাধিক ব্যাক্তি জানান, তাদের ধারনা এম.ভি আব্দুর রহমান-২ বাল্কহেডটি ডুবে যাওয়ার নেপথ্যে অনেক রহস্য থাকতে পারে। তারা এ ব্যাপারে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী জানান।

এদিকে সন্ধ্যা নদীতে ডুব্ েযাওয়া বাল্কহেডটি উদ্ধারের জন্য বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সংশ্লীষ্ট কর্তৃপক্ষ বরিশাল বিআইডব্লিউটি এর কাছে কোন ধরনের আবেদন করেননী। এবিষয়টি নিশ্চিত করে বরিশাল বিআইডব্লিউটিএর নদী বন্দর কর্তৃপক্ষের যুগ্ম-পরিচালক মো.মোস্তাফিজুর রহমান জানান।

এব্যাপারে এম.ভি আব্দুর রহমান-২ বাল্কহেডের মূল মালিক ঢাকার ধর্মগঞ্জ’র আব্দুর রহমানের কাছ থেকে মাসিক দেড় লাখ টাকা ভাড়া চুক্তি নেয়া নওয়াপাড়া নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশন শাখার সভাপতি মো.ইমরান মাষ্টার জানান, বানারীপাড়ার সন্ধ্যা নদীতে ডুবে যাওয়া এম.ভি আব্দুর রহমান-২ বাল্কহেডটি বিআইডব্লিউটি এর মাধ্যমে উদ্ধার করতে হলে যে পরিমান টাকা খরচ করতে হবে, এই মূহুর্তে তার ওই পরিমান টাকা খরচ করা সম্ভব নয়। ফলে তিনি কম খরচে পাশর্^বর্তী নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলার ডুবুরী দিয়ে বাল্কহেডটি উদ্ধার করার চেষ্টা করছেন। এক্ষেত্রে তারা শুক্রবার সকাল থেকে ওই বাল্কহেডটি উদ্ধার অভিযান শুরু করবেন বলে তিনি জানান।

এদিকে যশোরের নওয়াপাড়া বিসিআইসির ইউরিয়া সার নিয়ে নৌপথে উজিরপুর উপজেলার শিকারপুর আসার ব্যাপারে নৌ-যান শ্রমিক নেতা ইমরান মাষ্টার জানান, সম্প্রতি তিনি নওয়াপাড়ার লেবার সরদার মো.আনোয়ার হোসেন’র মাধ্যমে অভয়নগর ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির সঙ্গে বস্তা প্রতি ১৬ টাকা ভাড়া চুক্তিতে বিসিআইসির গুদার থেকে ৬৪০০ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে বরিশালের শিকারপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসেন। চুক্তি অনুযায়ী ১১ নভেম্বর তার এম.ভি আব্দুর রহমান-২ বাল্কহেডটি বিসিআইসির গুদাম থেকে ৬৪০০ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে ছেড়ে আসার কথা থাকলেও নৌ-যান শ্রমিক আন্দোলনের কারণে তিনি ১৪ নভেম্বর সেখান থেকে ওই বাল্কহেডটি ছেড়ে আসেন।এদিন রাতে তার বাল্কহেডটির সুকানী মো.শফিকুল ইসলাম, ইঞ্জিন চালক মো.আলাউদ্দিন ও লস্কর মো.আল আমিন ওই সার নিয়ে মঙ্গলা এলাকায় নঙ্গর করেণ। পরদিন সকালে সেখান থেকে তারা ওই বাল্কহেডটি শিকারপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসেন। ১৬ নভেম্বর তার বাল্কহেডটির মেশিন বিকল হয়ে পরলে সুকানী শফিকুল ইসলাম বাগেরহার জেলার ফুলহাতা-ঘশিয়াখালী এলাকায় নঙ্গর করেন। ২০ নভেম্বর সেখান থকে তারা বাল্কহেডটির মেশিন শেরে কাউখালী এসে নঙ্গর করেণ। ২১ নভেম্বর সকালে ওই বাল্কহেডটি সেখান থেকে শিকারপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। ওইদিন তারা শিকারপুর না গিয়ে বানারীপাড়ার খোদাবকশা দাখিল মাদরাসা সংলগ্ন সন্ধ্যা নদীতে নঙ্গর করেণ। ২২ নভেম্বর সকাল অনুমান সাড়ে ১০টার দিকে বাল্কহেডটির মেশিন রুমের তলা ফেটে ডুবে যায় বলে ইমরান মাষ্টার যুগান্তরকে জানান।

এঘটনায় ওই দিন রাতে তিনি বানারীপাড়া থানায় একটি সাধারণ ডায়রী করেন। একই রাতে সারের মালিক পক্ষ দাবী করে নওয়াপাড়ার লেবার সরদার মো.আনোয়ার হোসেন থানায় আরো একটি সাধারণ ডায়রী করেন। তাদের দু’জনের পৃথক ভাবে দায়েরকরা সাধারণ ডায়রী দু’টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে থানার অফিসার ইনচার্জ মো.হেলাল উদ্দিন জানান।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
   
Website Design and Developed By Engineer BD Network